ফিরে দেখা: আমার প্রথম কেওক্রাডং অভিযান | পর্ব ২


প্রথম পর্বের পর


যাত্রার শুরুতেই সে [শাহাবুদ্দিন] তার ননস্টপ টেপরেকর্ডার চালু করে দিলো। এই এলাকার আনারসের ফলন কেমন হয়, কবে থেকে শুরু করে, কোন গ্রামে গেলে সুন্দরী পাহাড়ি তরুণীদের সাথে ছবি তোলার সুযোগ পাওয়া যাবে, সব বিষয়েই সে অগাধ জ্ঞান রাখে। তার অনর্গল বকবকানিতে রেজা আর রিপন বিরক্তি প্রকাশ করতেই সে তার বকবকানি আরও বাড়িয়ে দিলো।

যাত্রার প্রথম পর্বটা ছিল অপেক্ষাকৃত কম কষ্টকর। প্রায় ৬০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের উপর অবস্থিত লাইরুনপি পাড়া পার হয়ে রুমা খালে নামলাম। শাহাবুদ্দিন এরই মধ্যে আমার স্পোর্টস গগলসটার দখল নিয়ে নিয়েছে। এ ধরনের রঙ্গিন চশমা সে জীবনে প্রথম দেখেছে (পরবর্তীতে অভিযান শেষ হওয়ার পর সানগ্লাসটা শাহাবুদ্দিনকে উপহার দিয়ে দেই)।

মাঝখানে আঁকাবাঁকা রুমা খাল ও তার পাথুরে অববাহিকা; আর তার দুপাশে উঁচু উঁচু সব পাহাড়। বাংলাদেশের এমন রূপ আমরা কখনও দেখিনি। পথেই পেয়ে গেলাম এক ত্রিপুরা পরিবার। পথের ধারে জুম চাষের ফাঁকে খেয়ে নিচ্ছে। মেন্যু হচ্ছে পাহাড়ি ঢেঁকি ছাঁটা লাল চালের ভাত, সঙ্গে শুধু লবন আর মরিচ। খাওয়া হচ্ছে কলাপাতার পাতে। পরিবারটির সাথে কয়েকটা ছবি তুলে আবার হাঁটা ধরলাম। চারপাশের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে দেখতে আমাদের আর তৃষ্ণা মেটে না।

রুমা ঝিরির দুই ধারে ভুট্টা আর তামাক ক্ষেত। যতদূর চোখ যায় উঁচু উঁচু পাহাড়। দূরের পাহাড়গুলো কালচে সবুজ রঙের দেখাচ্ছে। ঘণ্টা দুয়েক হাঁটার পর একটা মারমা গ্রাম পেলাম, নাম বগামুখ পাড়া। মারমারা সাধারণত নদী বা ঝিরিপথের ধারে তাদের আবাস গড়ে। ধর্মে বৌদ্ধ।

বগামুখ পাড়ায় বিশ মিনিটের একটা যাত্রা বিরতি দিয়ে বিস্কুট, চা, পানি, খেয়ে নিলাম। কিছু ছবি তুললাম। বগামুখ পাড়া আসলে একটা জাংশন। এখান থেকে একটা রাস্তা উঠে গেছে সাইকৎ পাড়ার দিকে। আরেকটা রাস্তা ঝিরিপথ ধরে আরও একটু এগিয়ে বগামুখ ঝর্ণার পাশ দিয়ে বগালেকের দিকে গেছে। ২য় পথটা অপেক্ষাকৃত সহজ হলেও আমাদের তা জানার কথা না। আমাদের এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে গাইড শাহাবুদ্দিন সাইকৎ পাড়ার রাস্তা ধরলো। কারণ অত্যন্ত কষ্টকর এই ট্রেইলটা কেওক্রাডংয়ে যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা।অদ্রি


রুমা খালে ট্রেকিং; বাঁ-দিক থেকে রেজা এবং আমি (১৭ই এপ্রিল, ১৯৯৮)


শাহাবুদ্দিনের পিছে পিছে আমরা পাহাড়ে ওঠা শুরু করলাম। রাস্তা প্রায় ৬০-৭০ ডিগ্রি খাড়া। ইতিমধ্যে সূর্য মাথার উপর অনেকটা তেঁতে উঠেছে। তার উপর চারিদিকে জুমের আগুনে পোড়া পাহাড় ঢালে এক টুকরো ছায়া নেই। ৩০০-৪০০ ফুট উঠতেই আমাদের অবস্থা কাহিল। থেমে পড়তেই শাহাবুদ্দিন জানালো সামনে একটা ঝর্ণা আছে, সেখানে গিয়ে পানি খেয়ে বিশ্রাম করা যাবে।

আবার ওঠা শুরু করলাম। শাহাবুদ্দিনের একটু রাস্তা আর শেষ হয় না। উপরের দিকে তাকিয়ে মনে হয় ঐ তো। আর ৫০ ফুট উঠলেই পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে যাব। ৫০ ফুট কোন রকমে উঠার পর দেখা গেল কোথায় চূড়া। আরও ১০০ ফুট উঠতে হবে। ঐ ১০০ ফুট ওঠার পরেও চূড়ার দেখা পাওয়া যায় না। রিপন এর নাম দিলো ‘পাহাড়ি মরীচিকা’।

পাহাড়ের মাঝামাঝি উঠার পর ঝর্ণার দেখা পেলাম। খুব বেশি হলে আধ ঘণ্টার মতো পাহাড় বাওয়া হয়েছে। তাতেই আমাদের কাহিল অবস্থা। ঝর্ণার পাড়েই তিনজন লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লাম। কয়েক মিনিট বিশ্রামের পর সাথের ঝোলা থেকে গ্লুকোজ আর স্যালাইন মিশিয়ে খাওয়ার পর মনে হল আবার নতুন জীবন পেলাম। শাহাবুদ্দিনের বুদ্ধিতে মাথা আর ক্যাপ ভিজিয়ে নিলাম। এ পদ্ধতিতে গরম কিছুটা কম লাগলো।

এরপর আবার পাহাড়ে উঠা শুরু হল। আরও ২০-৩০ মিনিট পর পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছলাম। ২০০০ সালে আমি এই পাহাড়টার নামকরণ করেছিলাম ‘রাসেল পাহাড়’। আমার অনেক অভিযানের সঙ্গী গোলাম রসূল রাসেলের নামে। বর্তমানে সে কানাডা প্রবাসী।অদ্রি

রাসেল পাহাড় পার হয়ে একই রকম আরও দুইটা পাহাড় পার হতে হল। এরপর দেখা পেলাম বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু বসতি সাইকৎ পাড়ার। বাঙালিদের কাছে যার পরিচিতি সৈকত পাড়া নামেও। ঘড়িতে তখন বাজে বারটা, আর আমাদের অবস্থাও বারোটা।

গাইড শাহাবুদ্দিন পাড়ার এক বাড়িতে আমাদের দুপুরের খাওয়া এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করলো। ১৯৯৮ সালে সাইকৎ পাড়ায় মাত্র আট/দশ ঘর লোকের বাস ছিল। আশেপাশের পাহাড়ি গ্রামগুলোর মধ্যে এরাই সবচেয়ে ধনী ছিল। এই পাড়ার সবাই বম জাতি এবং খ্রিস্টান ধর্মালম্বী।

গোসল সেরে এসে দেখলাম শাহাবুদ্দিন খাওয়ার আয়োজন করেছে। সে জানালো এখানে তরকারি তেমন কিছু পাওয়া যাবে না। একটা মুরগী কিনলে খাওয়াটা ভাল হবে। কিন্তু এই দুর্গম এলাকায় মুরগীর দাম ঢাকার থেকেও বেশি। আবার আমাদের বাজেটও অল্প। তাই শাহাবুদ্দিনকে বললাম আলু-টালু দিয়ে কিছু একটা ব্যবস্থা করতে। পরে অবশ্য বুঝেছিলাম মুরগীর প্রতি শাহাবুদ্দিনের আলাদা একটা আকর্ষণ আছে। কারণ এর পরে আমরা যে গ্রামেই থেমেছিলাম সে আমাদের কাছ থেকে মুরগীর পয়সা খসানোর জন্য চেষ্টার কোন ত্রুটি করেনি। কিন্তু আমাদেরও আপোষহীন অবস্থানের কারণে তার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।


আমাদের কেওক্রাডং সামিটের দিন; সুসাং পাড়া আর্মি ক্যাম্পের পাশ ঘেষে নতুন পাড়া নামক একটা ত্রিপুরা গ্রাম ছিল। ২০০৪ সালে সুংসনপাড়া গিয়ে এই গ্রামটা আর দেখিনি। পরে জেনেছি, নিরাপত্তার কারণে সেনাবাহিনী এই গ্রামটা অন্য কোথাও সরিয়ে নিয়েছিল।


যাই হোক, শাহাবুদ্দিন বেরিয়ে গিয়ে কোথেকে যেন কিছু আলু টালু নিয়ে আসে। কুটা বাছা শেষ করে আবার সে উদয় হল। এবার তার দরকার তেল। কিন্তু এবারও তাকে নিরাশ হতে হল। কারণ আমরা আমাদের রান্নার সকল তেল-মসলা রুমা রেস্ট হাউসে রেখে এসেছি। অগত্যা বেচরা পাহাড়ি ধানী মরিচ দিয়ে আলুর কি একটা ঘোড়ার ডিম রান্না করল। সাথে পাহাড়ি ঢেঁকি ছাঁটা লাল চালের ভাত। খেতে বসে প্রচণ্ড ঝালে আমাদের চোখের জল আর নাকের জল এক হয়ে গেল। আমাদের দুরাবস্থা দেখে শাহাবুদ্দিন দাঁত কেলিয়ে জানাল, এখানকার লোকেরা ম্যালেরিয়ার ভয়ে বেশি বেশি ঝাল খায়। কারণ বেশি ঝালে ম্যালেরিয়া কাছে ভিড়তে পারে না। (ইতিমধ্যেই সে আধ কেজি চালের ভাত সাবাড় করে ফেলেছে।) আমরা তাকে আশ্বস্ত করলাম ঔষধ আমাদের সাথেই আছে। তাকে আর কষ্ট করে ঝাল দিয়ে ম্যালেরিয়া তাড়াতে হবে না।

খাওয়ার পর গেরস্থের স্ত্রী আমাদের জন্য দুধ ছাড়া কফি নিয়ে আসলেন। এই কফি তারা পাহাড়েই চাষ করে থাকে। কফি খাওয়ার পর সবাই বাঁশের মেঝেতে সটান শুয়ে একটা ঘুম দিলাম।

ঘণ্টাখানেক ঘুমানোর পর একটা নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম (সৃষ্টিকর্তা কেন যেন কিছু বিব্রতকর অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য শুরুতেই আমাকে বেছে নেন)। ঘুম থেকে উঠে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য এদিক ওদিক খুঁজেও কোন শৌচাগার পেলাম না। বুঝলাম শৌচাগার ব্যবহারে অভ্যাস পাহাড়িদের নেই। বাংলাদেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে তখনও শৌচাগারের অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। সেক্ষেত্রে ওইসব অঞ্চলের ঝোপ-জঙ্গল বা জমির আইল মাড়ানোর সময় সাবধানে পা ফেলতে হয়। অসাবধানে কিসের উপর পা পড়ে যায়, বলা যায় না। কিন্তু শৌচাগার না থাকা সত্ত্বেও সাইকৎ পাড়ার আশেপাশের ঝোপ-ঝাড় এতো পরিষ্কার কেন বুঝতে পারছিলাম না।অদ্রি

জবাবটা পেলাম একটু পরেই। আমাকে একা জঙ্গলের দিকে দৌড়াতে দেখে কয়েকটা ‘লেন্ডি’ আমার পিছু নিয়েছিল। পাহাড়ের প্রতেকটা পাড়াতেই কুকুর আর শুকর পালন করা হয়। এদেরই আমরা লেন্ডি নামে ডাকি।
জঙ্গলের আড়ালে যখন প্রাকৃতিক কর্মটি সম্পাদন করছি, কয়েকটা  লেন্ডি তখন গভীর দৃষ্টিতে আমাকে পর্যবেক্ষণ করছে। এই পরিস্থিতিতে কিছুটা ভয় কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে কাজ শেষ করে মাত্র রওনা দিয়েছি, এমন সময় পিছনে লেন্ডিদের চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ পেলাম। পিছনে তাকিয়ে দেখি আমার ত্যাগকৃত কর্মকাণ্ড নিয়ে লেন্ডিদের মাঝে কাড়াকাড়ি। যেন তাদের পোলাও-কোর্মা খেতে দেওয়া হয়েছে।

কোন মতে বমি আটকে ফিরে এসে রেজা-রিপনকে সব খুলে বললাম। এবার রিপন চললো বাঁশ নিয়ে, যাতে সে নির্বিঘ্নে কাজ সারতে পারে। এদিকে লেন্ডিরা রিপনকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে রেজার কাজ সারতে তেমন বেগ পেতে হয়নি।

প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার পর্ব শেষ করে এসে দেখলাম রওনা দেওয়ার জন্য শাহাবুদ্দিন তৈরি হয়ে বসে আছে। এবার আমাদের গন্তব্য দার্জিলিং পাড়া। যাওয়ার আগে আমরা খাওয়া বাবদ গেরস্থকে কিছু টাকা দেওয়ার জন্য তাকে ডাকতে বললাম। কিন্তু শাহাবুদ্দিন কিছুতেই গেরস্থকে ডাকতে রাজি হল না। সে বললো, টাকা দেওয়া লাগবে না। তার আচরণ আমাদের কাছে খুব আশ্চর্য মনে হল। পরে বুঝেছিলাম, ঘরের অতিথিকে আপ্যায়ন করে তার কাছ থেকে বিনিময় নেওয়ার অভ্যাস পাহাড়িদের মাঝে নেই।

বিকাল ৪টায় আবার পথ চলা শুরু হল। এবার পথ কিছুটা সহজতর। পথে পড়ল পাহাড়ের গা জুরে বিস্তীর্ণ জুম ক্ষেত। জুমের জন্য পাহাড়ের গা পুড়িয়ে ফেলার কারণে মনে হচ্ছিল আমরা যেন কোন জীবন্ত আগ্নেয়গিরির গা ধরে হেঁটে যাচ্ছি, যেখানে কিছুদিন আগেই অগ্নুৎপাত হয়েছে। দূরের পাহাড়গুলো যেন একটার গায়ে আরেকটা হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। যারা এসব দৃশ্য দেখেনি তারা কল্পনাও করতে পারবে না সে কি জিনিস। স্বপ্নও এতো সুন্দর হয় না, আমরা বাস্তবে যা দেখেছি।


কেওক্রাডংয়ের চূড়ার পাশে হেলিপ্যাড 


বিকাল পাঁচটায় আমরা একটা তিন রাস্তার মাথায় এসে পৌঁছলাম। এর একটা রাস্তা গেছে দার্জিলিং পাড়া, একটা গেছে বগালেক আর আরেকটা আমরা যেদিক দিয়ে আসলাম, অর্থাৎ সাইকৎ পাড়ার দিকে। গত ১০ই ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে কেওক্রাডং যাওয়ার পথে এই তিন রাস্তার মাথাটা খুঁজে পাইনি। সাইকৎ পাড়ায় যেতে এখন হারমন পাড়ার রাস্তা ব্যবহার করা হয়। ১৯৯৮ সালে হারমন পাড়ার অস্তিত্ব ছিল না। আমি সাইকৎ পাড়ায় যাওয়ার এই পুরোনো রাস্তাটা সর্বশেষ ব্যবহার করেছিলাম ২০০৭ সালে। এখন এই রাস্তাটা আর খুঁজে পাওয়া যায় না; যেন এর অস্তিত্বই কখনও ছিল না।

এই তিন রাস্তার মাথায় এসে কাঁধে বন্দুক ওয়ালা এক পাহাড়ি শিকারীর দেখা পেলাম। শাহাবুদ্দিন তার সাথে কুশল বিনিময় করলো। এরপর আমাদের জানালো এই শিকারি একসময় শান্তি বাহিনীর সদস্য ছিল। শান্তি চুক্তির পর এখন ভদ্র হয়েছেন।

বিকাল সাড়ে পাঁচটায় দার্জিলিং পাড়ার প্রবেশমুখে এসে পৌঁছলাম। এখানেই দেখা হল দুই অপূর্ব সুন্দরী বম তরুণীর সাথে। শাহাবুদ্দিনের হঠাৎ মনে পড়ে গেল সে আমাদের সকালে কথা দিয়েছিল সুন্দরী পাহাড়ি মেয়েদের সাথে আমাদের ছবি তোলার ব্যবস্থা করে দেবে। সে তার কথা রাখার জন্য উঠে পড়ে লাগলো। কিন্তু অনেক জোরাজুরি করেও শাহাবুদ্দিন তাদেরকে ছবি তুলতে রাজি করাতে পারলো না পরে রেজা আর রিপন তাকে একাজ থেকে নিবৃত করে।অদ্রি

দার্জিলিং পাড়ার হেডম্যান সাংছিম কারবারির বাড়িতে আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হল। আমরা গেলাম ঝর্ণার পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতে। হাত-মুখ ধুতে এসে সাংছিম কারবারীর বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারলাম না। ঝর্ণা থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে সে পানি নিয়ে এসেছে গ্রামের মধ্যে। পানি ধরে রাখার জন্য সে একটা হাউজও নির্মাণ করেছে। বগালেকসহ রুমার অনেক গ্রামেই এখন এই পদ্ধতিতে ঝর্ণা থেকে গ্রামে পানি আনার ব্যবস্থা রয়েছে।

আমি অজু করে নামাজ পড়ে নিলাম। শেষ বিকেলের ম্লান আলোতে সাংছিম আমাদেরকে কেওক্রাডংয়ের চূড়া দেখালো। কেওক্রাডং দেখে আমাদের উৎসাহ আরো বেড়ে গেল। সময় থাকলে তখনই রওয়ানা দিতাম। আপাতত ইচ্ছেটাকে একরাতের জন্য ঘুম পাড়িয়ে আমরা ত্রিরত্ন পাহাড়ের কিনারায় বসে আড্ডায় মেতে উঠলাম। এই ফাঁকে প্রায় ২৫০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত দার্জিলিং পাড়ার তখনকার অবস্থা সম্পর্কে একটু ধারণা দেই:

[১] দার্জিলিং পাড়ায় তখন মোট ১৩-১৪ ঘর মানুষের বাস ছিল।

[২] রাতে খাওয়ার জন্য মুরগীর ডিম খুঁজতে পাঠিয়েছিলাম শাহাবুদ্দিনকে। সে পুরো গ্রাম ঘুরে মাত্র একটা ডিম পেয়েছিল। তাও দাম ছিল দশ টাকা। সেসময় ঢাকায় মুরগীর ডিমের হালি ছিল ১১-১২ টাকা।

[৩] তাদের একমাত্র জীবিকা ছিল জুম চাষ।

[৪] বমদের নিজেদের আলাদা ভাষা থাকলেও লেখালেখির জন্য এরা ইংরেজি অক্ষর ব্যবহার করে এই তথ্যটা প্রথম জানলাম দার্জিলিং পাড়ায় এসে।

সন্ধ্যার পর রিপনের বম ভাষা শিক্ষা পর্ব শুরু হল। শিক্ষক সাংছিম কারবারী নিজে। সাংছিমের ৫-৬ টা ছেলেমেয়ে। (২০১৫ সালে সাংছিমের এক মেয়ে, নবীয়ালের সাথে দেখা হয় বান্দরবান শহরে আমার খালাতো ভাই মুকিতের বাসায়। সে তখন বান্দরবান সরকারী কলেজে এইচএসসি পড়ে। তার আধুনিক শিক্ষা আর সাজ পোশাক দেখে অবাক হই আর ভাবি এই কি সেই সাংছিম কারবারীর মেয়ে, যাকে ১৯৯৮ সালে মায়ের কোলে একটা কুড়ে ঘরে দেখেছিলাম। সত্যিই, পর্যটন শিল্প একটা অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কতটা পাল্টে দিতে পারে তা না দেখলে বোঝা যায় না।) প্রায় ঘন্টা খানেক ভাষা শিক্ষা পর্ব শেষ করে আমরা রাতের খাবার খেতে বসলাম। মেন্যু লাল চালের ভাত আর পাহাড়ি কচুর ঝাল তরকারী।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমুতে গেলাম। আমরা সাথে করে একটা স্লিপিং ব্যাগ নিয়ে এসেছিলাম। আর সাংছিম তার ঘরে রাখা বেশ কিছু কম্বল দিলো। সমুদ্র সমতল থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত বলে রাতে এখানে প্রচণ্ড শীত পড়ে। এতো কম্বল থাকা সত্ত্বেও ঠাণ্ডার চোটে রাতে ঘুমুতে পারলাম না।

ভোর তিনটার দিকেই পাহাড়ি গ্রামগুলো জেগে ওঠে। এরপর সামান্য কিছু মুখে দিয়ে তারা জুমে যায়। আমরা ভোর সাড়ে চারটায় উঠে কেওক্রাডং যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। সাথে আনা চিড়া ভিজিয়ে চিনি দিয়ে খেয়ে নিলাম। রওনা দেয়ার আগে শাহাবুদ্দিনের পাল্লায় পড়ে রেজা আর রিপন কিছু ব্যোম তরুণীর সাথে ছবি তুলে বাধ্য হল।

অবশেষে শাহাবুদ্দিন তার দেয়া কথা রাখতে পারলো, এক্ষেত্রে ফটোগ্রাফার ছিলাম আমি। কিন্তু পরে দেখা গেলো ক্যামেরার যান্ত্রিক গোলযোগে ছবিগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এ নিয়ে রেজা আর রিপনের আফসোসের শেষ ছিল না।

রওনা দিতে দিতে পৌনে সাতটা বেজে গেল। এবার শুধু উপরে ওঠা। চল্লিশ মিনিট পর আমরা সাতটা পঁচিশ মিনিটে কেওক্রাডং শীর্ষে উঠলাম। চূড়ার উপরে একটা ফলক বসানো, তাতে লেখা-

KEOKRADANG
THE HIGHEST PEAK (3172 ft.) OF
BANGLADESH

ফলকটি ১৯৯৩ সালের আগস্ট মাসে মেজর মোশাররফ হোসেন স্থাপন করেছিলেন। এই তথ্যগুলোতে আমরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম। এটা যদি কেওক্রাডং হয় তাহলে তাজিংডং কোনটা। আমরা তো তাজিংডং চূড়া স্পর্শ করতে এসেছি। পাশেই আরেকটা পাহাড়ের চূড়ায় একটা হেলিপ্যাড আছে। শাহাবুদ্দিন জানালো এই হেলিপ্যাডটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য বানানো হয়েছিল। গত ছাব্বিশে মার্চ তাঁরই এই চূড়াটা উদ্বোধন করার কথা ছিল। তার কথা শুনে আমরা হেলিপ্যাডের কয়েকটা ছবি তুললাম। কিন্তু কেন যেন মন ভরছে না।


কেওক্রাডংয়ে চূড়ায়। বাঁ-দিক থেকে রেজা, আমি এবং রিপন। এই ফলকটি এখনও আছে, তবে স্থানান্তরিত হয়ে চূড়ার পূর্ব পাশে আছে।


প্রায় এক হাজার ফুট নিচে একটা গ্রামের হালকা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। শাহাবুদ্দিন জানালো ঐ গ্রামটার নাম সুসাং পাড়া, ওখানে একটা আর্মি ক্যাম্পও আছে। তিনজনে মিলে তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম সুসাং পাড়া আর্মি ক্যাম্পে যাব তথ্য নিশ্চিত হওয়ার জন্য। আমরা আসলে কোন পাহাড়ে উঠেছি? এটাই কি বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় ‘বিজয়’ কি না?

সুসাং পাড়া যেতে যেতে কেওক্রাডংয়ের তখনকার অবস্থা কিছুটা বর্ণনা করি।

[১] কেওক্রাডংয়ের ফলকটি এখনও আছে। তবে আগের অবস্থানে নেই।

[২] তখন কেওক্রাডংয়ে জুম চাষ হতো। আমরা যে সময় যাই তখন মাত্র পাহাড়টিকে জুম চাষের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। তাই আমরা সেখানে কোন বাঁশ ঝাড় বা গাছপালা পাইনি।

[৩] চূড়ায় ওঠার জন্য বা হেলিপ্যাডে ওঠার জন্য কোন সিড়ি ছিল না।

[৪] তখনও পাসিংপাড়া বা হারমন পাড়ার জন্ম হয়নি।

[৫] কেওক্রাডং চূড়ার পাশে রাস্তার উপর কোন সংকেতও ছিল না যেটা দেখে কেউ বুঝতে পারবে যে কেওক্রাডংয়ে পৌঁছে গেছে। আমাদের অভিযান কাহিনী দৈনিক ভোরের কাগজে ছাপা হওয়ার পর অনেক অভিযাত্রী কেওক্রাডং সামিট করে। তখন স্থানীয় গ্রামবাসীরা চূড়ার পাশে বাঁশের একটা মার্কিং রাখে। কারণ তখন কেওক্রাডং সারাবছর বাঁশছাড় আর জঙ্গলে পরিপূর্ণ থাকতো। সম্ভবত ২০০১-০২ সালের দিকে চূড়ায় ওঠার জন্য রাস্তা থেকে পাকা সিড়ি তৈরি করা হয়। (অসমাপ্ত)

পরের অংশ পড়ুন এখানে


 

(Visited 1 times, 1 visits today)
মারুফ বিন আলম
মারুফ বিন আলম
পেশায় একজন ব্যাংকার। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে জাতীয় টেলিভিশনে কুইজে অংশগ্রহণ করেন। একসময় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিজ্ঞান বিষয়ে লিখেছেন, আয়োজনে অংশ নিয়েছেন নানা মজার সায়েন্স প্রজেক্টে। বিশ্বাস করেন, এমন কোন কিছুই করা উচিত নয়, যা প্রকৃতি আমাদের অনুমোদন করে না। ভালবাসেন ঘুরাঘুরি, খামাড়বাড়ি ও বৃক্ষরোপণ ।