পাহাড় বড় আশ্চর্য জায়গা

আমার প্রথম পাহাড় দেখার ঘটনা ২০১১/১২ তে, ব্যাচমেটদের সাথে রাঙ্গামাটি যাওয়া। জন্মের পর থেকে প্রথম ১৮ বছর কেটেছে চট্টগ্রামে। পাহাড়, সমুদ্র, নদী মিলে এরকম চমৎকার শহর আমি কমই দেখেছি এখনো। অথচ এই ১৮ বছরে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি তো নয়ই, সীতাকুন্ড পর্যন্ত যাইনি কখনো। বাসায় বই পড়া, টিভি দেখা, আরও নানা শখের ব্যাপার ছিল, কিন্তু ঘুরতে তেমন আগ্রহ ছিল না, সে ছিল বিলাসিতা।

২০১২-র পর আবার পাহাড় দেখা ভারতের মাটিতে। চন্ডীগড় থেকে শিমলা যাবার পথে বাস মাঝরাতে উপরে
উঠে এসে হাইওয়েতে ব্রেক নিল। আমি প্রথম দেখলাম ওপরে নিচে ৩৬০ ডিগ্রিতেও তারা দেখা যায়, উপর থেকে
নিচের চন্ডীগড়ের সমস্ত আলোর বিন্দু, উপরে ঝকঝকে আকাশ। ২০১৫ র জানুয়ারী সেটা। ভোরবেলা শিমলাতে নেমে
প্রথম দেখলাম হোটেলের লবি থেকে নিচেও রুম থাকতে পারে, উপরেও! প্রথম দেখা কোন হিল স্টেশন,

পাহাড়ের গায়ে গায়ে একটা আস্ত শহর, রাতে অজস্র আলো জ্বলে।  এরপর অলৌকিক শিমলা মানালি হাইওয়ে,
মানালির পাহাড়ি নদীর ব্রিজে লাল-নীল পতাকা। এতদিন শুধু টিভিতে আর ক্যালেন্ডারে দেখা তুষারশুভ্র
পর্বত হোটেলের জানালা দিয়ে সকালবেলা দেখা যাচ্ছে!

 

এরপর বহুবারই অনেকটা উচ্চতায় যাওয়া হয়েছে- বান্দরবান, সিলেট খাগড়াছড়ি থেকে সাহস করে একা দার্জিলিং, আবার শিমলা মানালি হয়ে লেহ, প্যাংগং লেক, কাশ্মীর। পরে আবার থিম্পু পারো হা ভ্যালি। মাঝে আবার ফেলুদার দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি। পাহাড় বড় আশ্চর্য জায়গা। আমি কোনভাবেই এক্সট্রিম স্পোর্টসবাজ নই, মাউন্টেনিয়ারিংয়ের নেশাও নেই। আমি শহরের ছেলে, পাহাড়ে যাই পাহাড়কে দেখতে, পাহাড়ের মানুষ দেখতে, পাহাড়ের শহর-বাজার-জনপদ দেখতে।

পাহাড়ের মানুষ আমার কাছে পাহাড়ের চেয়েও বড় বিস্ময়। এখনো পর্যন্ত একটি ক্ষুদ্র বাজে অভিজ্ঞতাও নাই। পাহাড়ের মানুষ সর্বত্র এমনি ভাল লোক হয়, নাকি আমার কপাল ভালো-বলতে পারি না। তবে আমার বিশ্বাস নিশ্চয়ই উপরে থাকার একটা ব্যাপার আছে। কিছু দর্শন শুধু উঁচুতে থাকা মানুষেরই থাকে, ঈশ্বরের কাছাকাছি থাকে বলেই হয়ত!

আমার একটা আঁকার যন্ত্র আছে, যখন নানান চাপে আটকে পড়ে বন্দী থাকি, তখন এই যন্ত্রটা খানিকটা ওষুধের কাজ করে। একটা চমৎকার স্মৃতিতে ভর করে কিংবা একটা ন্যাটজিও বা ইউটিউব চ্যানেলে দেখা স্থান, যেখানে কখনো মনে হয় যেতে পারবো না’- এরকম একটা জায়গার ঘোর ঘোর দৃশ্য খানিকটা চেষ্টায় দাঁড় করানো যায়। সেটাতে রঙ আলো-ছায়ার গড়মিল প্রচুর থাকলেও আমি খানিকক্ষণ আরাম পাই, বন্দীত্বের কষ্ট কমে। অনেকগুলো আঁকার পর গুনে হঠাৎ পাহাড়ের ছবিই বেশি দেখলে সেটা তেমন কাকতালীয় মনে হয় না। আরেকটু বয়েসে ভুটান কিংবা অন্য কোথাও একটা ছোট্ট পাহাড়ি শহরে চলে যাব- এরকম একটা স্বপ্ন স্বাভাবিক মনে হয়। যেখানে গেলে সাধারণ সবকিছু থেকে একটু উপরে মনে হবে নিজেকে, পাহাড়ী লোকালয়ের উঁচু-নিচু একশ বাঁক নেওয়া রাস্তা, গলি বাজারের আওয়াজ, ঘরের উঠান থেকে হিমালয় দেখা, একটা ভালমানুষ নাকবোচা পাহাড়ি মেয়ে, ঝকঝকে নীল শালের মত আকাশ, কাছে কাছে থাকা মেঘেরা, দারুণ শীতে একগাদা লেপ গায়ে ঘুমানো, পাহাড়ে-বরফে-জঙ্গলে সঙ্গীবিহীন ট্রেক – সবকিছুই ভাবলে লোভ লাগে।

পাহাড়ে গেলেই যেন ছুটি, প্যাঁচগোছ নেই, ছুটে ছুটে চলা নাই, পাহাড় মানেই কেমন একটা মুক্তির গন্ধ, একটা বিশাল বিশাল মনের ভাব। একটা নিখাদ বিস্ময়ের ভাব – যে বিস্ময় নাকি সকল দর্শনের জনক।

সম্ভবত একেবারে শুরুর দিকে প্রথম গ্রাফিক প্যাডে আঁকা ছবি,
স্বাভাবিকভাবেই ডিপার্ট্মেন্ট থেকে যাওয়া ইন্ডিয়া ট্যুরের স্মরণে।
জীবনে প্রথমে দেখা মানালির আকাশ! কাঠের বাড়িঘর, ছোট্ট গ্রাম।

 


মুন টেম্পল
নিখাদ স্বপ্নদৃশ্য এরকম কোথাও আমি কখনো যাইনি।
এরকম কোনো মন্দিরে গভীর রাতে পৌঁছানো হয়নি।
এতবড় একটা চাঁদের দিনে অনেক উঁচু কোথাও
একটা যাবার কথা ভেবে আঁকা।

সম্ভবত এটা রুংরাং যাবার সময়ের কথা মনে করে আঁকা।
পরপর দুদিন হাঁটতে হয়েছিল সেবার। দুছড়ি পাড়ায় একটা স্কুলের সামনে মাঠের মত ছিল। কি আশ্চর্য ছিল সেই রাত, মাঠে শুয়ে তারা দেখার রাত।
ঝকঝকে রোদ ছিল, অনেক গরম ছিল- যেদিন রুংরাং পর্যন্ত গেলাম।

ভুটান এমন একটা দেশ যেখানে শান্তি বিরাজমান, যেখানে সমাজ ব্যবস্থা আর মানুষ একটা ইউটোপিয়ার মত।  উঁচু উঁচু পাহাড়ের গায়ে গায়ে ধাক্কা খাওয়া রোদ, এদিক থেকে ওদিকে ঘুরে আবার ছায়া। ভ্যালীতে তৈরি হওয়া খুদে এই শহরে একদল শান্ত ভালমানুষ থাকে যারা অনেক মাংস আর মদ খায়-এই হচ্ছে ভুটানের স্মৃতি, আর অবিশ্বাস্য পর্বতমালা।

এটাও স্বপ্নদৃশ্যই প্রায়। নেট থেকে নামানো ছবি দেখে আঁকা। এক্সপেডিশনে কখনোই যাইনি, বিশাল উচ্চতায় ট্রেক/মাউন্টেনিয়ারিংয়ের অভিজ্ঞতা তো শূন্য বটেই। কিন্তু জলদি যাবার ইচ্ছা। আরো একা, আরো বিশাল কোনো পর্বতের মুখোমুখি কেমন লাগবে তাও জানা দরকার। এটাও স্বপ্ন দেখতে দেখতেই আঁকা, ঘোরের ছবি।

লাদাখ যাওয়াটা জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আর দুর্ঘটনা। শিমলা-মানালি-কেলং- লাদাখ হাইওয়ে যাত্রার চেয়ে ভাল কিছু আমার জীবনে আবার কবে ঘটবে তা নিয়ে সন্দিহান। এই অসম্ভব স্কেলের ল্যান্ডস্কেপ আর এমন রাতের আকাশ দেখবো এমন ভাবিনি কখনো। প্যাংগং লেকের পাশে তাঁবুতে থাকা রাতগুলো!…আসলে লাদাখ নিয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করাই অর্থহীন।

এই ছবিটা সম্ভবত ইউটিউব দেখে আঁকা, তখনো লাদাখ যাইনি,
কিন্তু ভাবি একদিন তো যাব তাই মহা আগ্রহে ডকু, ভিডিওগ্রাফ আর ব্লগ দেখি।
লাদাখের কথা ভেবেই আঁকা। কোন দিন এই ছবির মত
ক্যারাভান করে ক্যামেরা, যন্ত্রপাতি নিয়ে যাবার ইচ্ছা আছে।


(Visited 1 times, 1 visits today)

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)