রক ক্লাইম্বিং: পাথুরে ভালোবাসার অপর নাম


বছরের শুরুতেই ফেসবুকে বেসিক রক ক্লাইম্বিং কোর্সের নোটিফিকেশন পাই ‘অদ্রি মাধ্যমে’। প্রথমটায় কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম যাব কি, যাব না-এই নিয়ে। শেষে খুব বেশি না ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিলাম। নিজেকে জানার জন্য, নিজের কতটা সামর্থ্য তা দেখার জন্য, এক প্রকার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়লাম নিজের দিকে।

শুরু হল একটু একটু করে আমার প্রস্তুতি। প্রথমে মানুসিকভাবে নিজেকে তৈরি করা, সামান্য কিছু শারীরিক কসরত করা শুরু করলাম। এভাবে দিন গড়িয়ে সময় হল রওনা হবার, ২৫ অক্টোবর, ২০১৭।

২৬ তারিখ ভোরবেলা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে, শুশুনিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিমবঙ্গ।

প্রথম দিনটা ছিল আসলে রকের সাথে নিজের সড়গড় হওয়ায় ব্যাপার স্যাপার। আর সেটা শুরু হল তাত্ত্বিক ক্লাসের মাধ্যমে। এখানে আমরা শিখলাম, রকের সামনে দাড়িয়ে ক্লাইম্বিং শুরুর আগে নিজের প্রস্তুতি কি হবে, দাঁড়ানোর পোজিশন, রক ফেস পর্যবেক্ষণ এবং নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইত্যাদি এমন কিছু সাধারণ কিন্তু অতি গুরত্বপূর্ণ বিষয়। শিখে নিলাম নানা রকম হোল্ডগুলোর নাম যেমন: পকেট, পিঞ্চ, ইন কাট, সাইড কাট, জাগ হোল্ড ইত্যাদি।

এভাবে ক্লাস করে মৌলিক কিছু ধারণা হবার পরই সুদীপ্ত দাদা(প্রশিক্ষক) তুলে দিলেন বোল্ডারে(বড় কিন্তু উচ্চতায় ছোট পাথর)। সেই প্রথম হাত রাখলাম পাথুরে এক নেশার গায়ে।

পুঁথিগত বিদ্যা হজমের সবচেয়ে ভাল উপায় যে ব্যবহারিক কাজ, তার প্রমাণ পেতে শুরু করলাম। হোল্ডস গুলো ধরে বুঝতে চেষ্টা করলাম কি হোল্ড সেটা।

এরপর উঠলাম স্টেয়ার কেসে ফ্রি হ্যান্ডে, তারপর ‘মানিক দা’ নামের রক ফেসে, যদিও অনেক কসরতের পর। এভাবে আগাচ্ছিলাম আর বুঝতে পারছিলাম কেমন ধাপে ধাপে সহজ থেকে কঠিনের দিকে যাচ্ছি আমরা।


বেসিক রক ক্লাইম্বিং কোর্স (ব্যাচ-৫)

সারাদিন শেষে সন্ধ্যা নেমে এলে আমরাও নেমে আসলাম ক্যাম্পে। এরপর আবার শুরু হল তাত্ত্বিক ক্লাস, এবার আমাদের সামনে ক্লাইম্বিংয়ের সরঞ্জামের নানান পশরা সাজিয়ে বসলেন দাদা। মাউন্টেনিয়ারিংয়ের সরঞ্জাম মানেই ক্যারাবিনার, ফিগার অব এইট-এগুলা আমরা জানি, কিন্তু শুধু রক ক্লাইম্বিংয়ের সরঞ্জামগুলো কেমন তা হাতে নিয়ে দেখেছি, উপযুক্ত ব্যবহার সম্পর্কে এই কোর্সে জেনেছি। এর মধ্যে ছিল চোক নাট, এথ্রিয়ার, ফ্রেন্ডস ইত্যাদি। শেষের দিন আমরা রক ফেইসে কিছু ইকুইপমেন্ট লাগিয়ে চর্চাও করেছিলাম।

তারপর দেখানো হয় অসুস্থ বা বিপদে পড়া পর্বতারোহীকে কিভাবে রেসকিউ করা হয় তার কৌশল। এরপর বাকি দিনগুলি আমরা নানা রকম রক ফেইসে ক্লাইম্ব করি, শিখে নেই ক্লাইম্বিংয়ের ভাষা। এক একটা নতুন রুটের টেকনিক্যাল ডিফিকাল্টিস ছিল এক এক রকম। যার মধ্যে চিমনি ক্লাইম্বিং ছিল সবচেয়ে মজার আর শকুনি(ওভার হ্যঙ্গ একটা ফেইস) ছিল সবচেয়ে কঠিন, যেটা আমারা কেউ ক্লাইম্ব করতে পারিনি।

এরপর আরও ক্লাস করলাম র‍্যাপলিং, জুমারিং, বিলে আর আমার সবচেয়ে প্রিয় টপিক রোপ নটের উপর। এভাবে জানা আর শেখার মাধ্যমেই কেটে গেল চারটা দিন। শেষ দিন একটা পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে সমাপ্তি হল কোর্সের।

খুব সংক্ষিপ্তভাবে বললে এই ছিল বেসিক রক ক্লাইম্বিং কোর্স। বিস্তারিত লিখলে আসল বিষয়টা বোঝানো সম্ভব না, তাই এটুকুই লিখলাম। কিন্তু এসবের বাইরেও অনেকগুলো প্রশ্ন থেকে যায় মনে, যেগুলো যাবার আগে আমার মনে ভিড় করেছিল। নিজের মত করে তেমন কিছু প্রশ্নের উওর দিচ্ছি,

কেন যাব রক ক্লাইম্বিং কোর্সে?

যারা ভ্রমণ করেন, অনেক জায়গায় নিজেদের মত ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে নতুন কিছুর স্বাদ খুঁজেন,তাদের জন্য এই কোর্স ভিন্ন অনূভুতি এনে দিবে, নিশ্চিত।

আর রক ক্লাইম্বিং যতটা থ্রিলিং,মজার ততটাই ঝুঁকিও জড়িত এর সাথে, তাই না জেনে বুঝে ক্লাইম্বিংয়ে নামার চেয়ে জেনে শুরু করলে নিজের সুবিধাও যেমন হয় ঝুঁকিগুলোও কমে আসে। আবার নিজের শেখা সুনিপুণ হলে অন্যকে শেখানো যায়।

আর সব থেকে বড় বিষয় আমার কাছে মনে হয়েছে, এই কোর্স নিজের সম্পর্কে অনেক ধারণা দিবে আপনাকে। নিজের ক্ষমতা, সহিষ্ণুতা, ধৈর্য এই বিষয়গুলো আরও খোলাশা হবে নিজের কাছে। (এটা শুধুমাত্র আমার ব্যক্তিগত অভিমত, অন্যদের কাছে এমনটা মনে নাও হতে পারে।)


চার দিনে কতটুকু শিখব?

এটা বলাই বাহুল্য চার দিন রক ক্লাইম্বিংয়ের মত বিস্তৃত বিষয়কে জানার জন্য যথেষ্ট না। কিন্তু এই কোর্সের ডিজাইনটা আমার কাছে সেরা মনে হয়েছে। ধীরে ধীরে সহজ থেকে কঠিন দিকগুলো স্পর্শ করা হয়েছে। আর চারদিনে একটা সাধারণ ধারণা আপনি পাবেন যেটা পরবর্তিতে এই বিষয়ের সাথে যুক্ত হতে গেলে সহয়তা করবে।

শিখে কি লাভ হবে?

সবকিছু লাভ ক্ষতিতে মাপা যায় না- এটা জানলেও অবচেতন মন সেটা মানতে চায় না, আরও বড় কারণ এখানে একটা বিনিয়োগের বিষয় জরিত আছে। এই কোর্সে যা শিখবেন তার মাঝে অনেক কিছুই লাইফ স্কিলকে সমৃদ্ধ করবে, যা আপনার যে কোন ভ্রমণে আপনাকে সাহায্য করবে, যেমন: রেসকিউ পদ্ধতি জানা এটা আমাদের পাহাড় গিয়েও দরকার হতে পারে। আর সবথেকে বড় যা পাবেন তা হল আত্মতৃপ্তি।

রিটার্ন অন মানি ভ্যালু কতটা?

যেহেতু আমি কিছু অর্থ আর সময় ব্যয় করছি এই কোর্সের জন্য তাই সেখান থেকে আমার রিটার্নটাও তেমন হবে এটা আশা করাই স্বাভাবিক। আমার মতে বেশি না ভেবে চলে যান, খুব ভাল অনুভূতি নিয়ে ফিরবেন। বরং মনে হবে যা দিয়েছেন তার থেকে বেশি কিছু নিয়ে ফিরছেন।

যাবার আগের প্রস্তুতি কি হবে?

প্রতিটা কাজের আগে প্রস্তুতি কাজটাকে সহজ করে তুলে বহুগুণ। তাই যাবার আগে কিছু ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ করলে ক্লাইম্বিংয়ের সময় শরীর অনেক ফ্লেক্সিবল থাকবে, এতে করে বিষয়টা কষ্টসাধ্য মনে না হয়ে উপভোগ্য হয়ে উঠবে। আর কি কি নিতে হবে-সবকিছু জানা যাবে যাবার আগে, যা অদ্রি থেকে জানানো হয়।

বাংলাদেশে রক নাই, আমরা শিখে কি করব?

হ্যাঁ, আমাদের রক নাই- এটা নিরুৎসাহিত হবার মত বিষয়, কিন্তু আমাদের দেশের পর্যটন খাত এগুচ্ছে। সামনে আরও ভালো কিছু হবে। আমাদের দেশে আর্টিফিশিয়াল রক ওয়াল তৈরি করার পরিকল্পনা হচ্ছে। আর তা বাস্তবায়িত হলে উঠব তো আমরাই, তাই এক ধাপ না হয় এগিয়েই থাকলাম। আর এই কোর্স করে এসে আমাদের দল ভারি হলে আমাদের আবদারের জোরেই হয়ত তৈরি হবে রক ওয়াল।

সবশেষে এটাই বলব রক ক্লাইম্বিং এমন একটা অনুভূতির নাম যেটা একবার পাবার পর বারবার পেতে ইচ্ছা হয়, তাই বেশি না ভেবে কোর্সে চলে যাওয়াই ভাল।

(Visited 1 times, 1 visits today)

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)