পর্বতারোহণ বিষয়ক যে ৫টি তথ্যচিত্র সবার দেখা উচিত


সব ধরণের স্বপ্ন ছোঁয়া এক জীবনে সম্ভব না। হয়তো এজন্যই জীবন অমূল্য। আমৃত্যু তৃষ্ণা নিয়ে বাঁচার মধ্যেই হয়তো আছে জীবনের অর্থ। দূরদেশের কোন পর্বত নিজের চোখে দেখা সম্ভব না হলেও কৃত্রিম চোখের কারণে ঘরে বসেই অভিযানের খুঁটিনাটি নিজ চোখে দেখা, অনুভব করা এখন সহজলভ্য। বই, পুরোনো কোন ঐতিহাসিক অভিযানের গল্প, পৃথিবীর আরেক প্রান্তে ঘটে যাওয়া কোন অসাধারণ অ্যাডভেঞ্চার, সবকিছুই প্রযুক্তির কারণে আমাদের হাতের মুঠোয়। জীবন বাজি রেখে বানানো এসব ডকুমেন্টারী/এডাপ্টেড সিনেমা তাই স্ক্রিনের এক পাশ থেকে আমাদের নিয়ে যায় পৃথিবীর আরেক প্রান্তে। কল্পনায় দেখা ভালোবাসার পাহাড়গুলোকে নিয়ে বানানো তথ্যচিত্রগুলো তাই প্রতিটি পাহাড়প্রেমীদের দেখা উচিত।


The Wildest Dream (2010)

‘Because, it’s there’

১৯২০ এর দশক, অভিযানের স্বর্ণযুগ। প্রকৃতির সব রহস্য একে একে মানুষের অদম্য স্পৃহার কাছে হার মেনে নিচ্ছে। সর্বশেষ একটি বাধা অতিক্রম করাই তখন বাকি। কিন্তু তৎকালীন বিশ্বাস ছিলো ওই উচ্চতায় কোন মানুষ বেঁচে থাকতে পারবে না, এটা অসম্ভব।

শুধু একজন ছিলেন সবার চেয়ে ব্যতিক্রম, জর্জ হারবার্ট লি ম্যালরি।

প্রায় ৭৫ বছর পরে কনরাড অ্যাংকর ম্যালরির দেহাবশেষ খুঁজে পাবার মাধ্যমে জন্ম নেয় এক নতুন বিতর্কের। কনরাড এবং লিও তৎকালীন প্রযুক্তি, পোশাক ব্যবহারের মাধ্যমে সবাইকে দেখিয়েও দেন যে ম্যালরি এবং আরভাইন এর পক্ষে চূড়ায় পৌঁছানো সম্ভব ছিল।

তাহলে কি ম্যালরিই ছিলেন প্রথম এভারেস্ট আরোহী ব্যক্তি?


K2: siren of the Himalayas (2012)

‘After weeks of examination and after hours of contemplation and search for the secret of the Mountain, the Duke was finally obliged to yield to the conviction that ….K2 is not to be climbed’

কে-২ আরোহণে দ্বিতীয় অভিযানটি ১৯০৯ সালে প্রিন্স লুইগি আমেডিও, ডিউক অব আবুরাজ্জির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। সেই অভিযানের ১০০ বছর পূর্তিতে ২০০৯ সালে ফাব্রিজিও জানগ্রিলি, জেক মায়ার, ক্রিস সিজমিক, জারলিনডি কালটেনবারনার কে-২ অভিযান চালান।

অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি, একই সাথে ১৯০৯ এবং ২০০৯ সালের অভিযানের পাশাপাশি বর্ণনা, কে-২ এর রুট, অভিযানের ইতিহাস, ঝুঁকি, ব্যক্তিগত অর্জন, অবিশ্বাস্য শারীরিক কষ্ট, আমার মতে কে-২ না নিজ চোখে না দেখে, এই পর্বতকে কোনদিন আরোহণের চেষ্টা না করে, এই পর্বতকে অনুভব করার সবচেয়ে ভালো তথ্যচিত্র এটা।


The Summit (2012)

‘In the morning, we set out again and after a short while, we came across three climbers from South Korea, hanging upside down, held by a cord attached to their waists. Two were unconscious. For three hours, we tried to untie them, but it was in vain. All three died. It was at that moment, he refused to descend because he decided to help others that were injured. It was the last time I would see my friend alive.’- Marco Confortola

তিনি চাইলে সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে নেমে যেতে পারতেন। তার পরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল না, প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল না। পর্বতারোহণের অলিখিত নিয়মের একটি হচ্ছে সবার আগে নিজের প্রাণ। কিন্তু কিছু মানুষের জন্মই হয় নিয়ম ভাঙ্গার জন্য, এসব মহাপুরুষদের অতিমানবীয় কিছু ত্যাগ আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।

১ আগস্ট, ২০০৮। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর কে-২ ট্র্যাজেডি। ১১ জন পর্বতারোহী এই দিনে প্রাণ হারান। কিন্তু একজন ক্লাইম্বার, প্রথম আইরিশ কে-২ সামিটার জেরার্ড ম্যাকডোনিল সবার মধ্যে আলাদা।নিচে না নেমে নিজের সামর্থ্য, শক্তি তিনি আহতদের জন্য ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তাকে ছাড়াই তার সঙ্গীকে নিচে নামার জন্য অনুরোধ করেন। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত অবস্থায় তিনি তার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে চাননি, অন্যদের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন।


Touching the Void (2003)

পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য হিউম্যান সারভাইভাল স্টোরির মধ্যে এটি অন্যতম।

১৯৮৫ সালে জো সিম্পসন, সাইমন ইয়টেস পেরুভিয়ান আন্দিজ পর্বতমালার মধ্যে অন্যতম দুরূহ, টেকনিক্যাল, আনক্লাইমড  সিউলা গ্রান্দে ওয়েস্ট ফেইস (West face of Siula Grande) আরোহণের সিদ্ধান্ত নেন। এই দুর্ধর্ষ দুই ক্লাইম্বার মাত্র তিন দিনের মধ্যে চূড়ায় পৌঁছে যান। কিন্তু অবতরণের সময় জো পড়ে গেলে তার পা ভেঙ্গে যায়। রোপিংয়ের মাধ্যমে সাইমন অবিশ্বাস্য কায়দায় জো’কে একটু একটু করে নামাচ্ছিলেন, এরপর নিজে নামছিলেন। কিন্তু এক পর্যায়ে যখন রোপ ‘ওভার হ্যাং’ হয়ে যায় এবং কোনভাবেই জো আর ক্লাইম্ব করে তার সমাধান করতে পারছিলো না, সাইমন সিদ্ধান্ত নেয় দড়ি কেটে জো কে সাহায্য করার। কিন্তু দড়ি কাটার সাথে সাথেই জো পড়ে যান পাহাড়ের একদম নিচে ক্রেভাসে। কোন ভাবেই আর জো’র বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই বুঝতে পেরে, হতবিহব্বল, শোকে জর্জরিত সাইমন নিচে নেমে যাতে থাকেন।

এই ঘটনার পর পরই  থেকে জন্ম নেয় প্রকৃতির প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক অতিমানবীয় ঘটনা।


The Alps (2010)

১৯৬৬ সাল, জন হারলিন-II তার পরিবার, তার সন্তান ফেলে বেড়িয়ে পড়েন ইউরোপের সবচেয়ে দুরূহ, কঠিন কিন্তু সবচেয়ে সম্মানজনক মাউন্ট আইগারের নর্থ ফেস (Nordwand) আরোহণের উদ্দেশে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আরোহণের সময় তিনি মারা যান।

৪০ বছর পরে আরও একজন পর্বতারোহী আইগারের নর্থ ফেস আরোহণের উদ্দেশ্যে বাড়ী থেকে বের হন।কারণ এই পর্বত ৪০ বছর আগে তার বাবার জীবন কেড়ে নিয়েছিল।

তথ্যচিত্রটি  জন হারলিন-III এর ‘The Eiger Obsession: Facing the Mountain that killed my Father’ বই অবলম্বনে নির্মিত।


 প্রচ্ছদ ছবি [Touching the Void (2003)]

(Visited 1 times, 1 visits today)
আল-আমিন খান
আল-আমিন খান
চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক। একা থাকতে, পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুড়ে বেড়াতে, সিনেমা দেখতে ও গান শুনতে ভালোবাসেন। কোন একদিন তুন্দ্রা অঞ্চলে ক্লান্তিহীনভাবে হেঁটে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখেন।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)