ন্যাভিগেশন সহজ করার ৪ টি কার্যকরী অ্যাপস

পাহাড়-পর্বত বা বনে-জঙলে ন্যাভিগেশনের জন্য হ্যান্ডহেল্ড জিপিএস রিসিভার অভিযাত্রীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু অত্যধিক দাম ও স্থানীয় বাজারে এর অপ্রাপ্যতার কারণে অনেক সময়ই আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। যারা জিপিসের বিকল্প কি হতে পারে তার খোঁজ করছেন তাদের জন্যই এই লেখা।

আজকালকার আধুনিক মোবাইল সেটগুলোতে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম ইন-বিল্ট হিসেবে থাকে। কিছু কিছু সেটে গ্লোনাস সিস্টেমও ইন্টিগ্রেট করা থাকে। যা ব্যবহার করে আমরা সহজেই অফট্রেইলে আমাদের ন্যাভিগেশনের কাজটা খুব ভালোভাবেই করতে পারি।

অনলাইনে একটু খোঁজ করলে অসংখ্য  ম্যাপিং/ন্যাভিগেশন অ্যাপ্লিকেশন পাওয়া যাবে। যার কিছু অনলাইন আবার কিছু অফলাইনে ব্যবহার করা যায়। এত এত অ্যাপসের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কোনটা ছেড়ে কোনটা ব্যবহার করব, কোন অ্যাপসটি সবদিক থেকে ভাল হবে? এ নিয়ে সবসময়ই অনেক দ্বিধায় থাকতে হয়।

শহরে বা যেখানে ইন্টারনেট রয়েছে, সেখানে জিপিএস অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করা এমন কোন কঠিন কাজ না। এইক্ষেত্রে লোকেশনসহ অন্যান্য তথ্য খুব সহজেই দিতে পারে অ্যাপসগুলি। সমস্যা হয় তখনই, যখন আমরা চলে যাই কোন অফট্রেইলে; যেখানে না থাকে কোন নেটওয়ার্ক, না থাকে ইন্টারনেট।

এত এত অ্যাপ্লিকেশনের মধ্যে কিভাবে বুঝব কোন অ্যাপ্লিকেশনটি আমার জন্য সেরা? অান্তর্জালে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার অ্যাপ্লিকেশনের মধ্যে খুবই কমসংখ্যক অ্যাপ্লিকেশন আছে যেগুলি সত্যিকার অর্থে নির্ভুলভাবে অফলাইনে ব্যবহার করা যায়। ইন্টারনেট, বিভিন্ন রিভিউ ওয়েবসাইট আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এরকম চারটি এপ্লিকেশনের কথা লিখব আজ।

[১] ViewRanger – Explore Rides & Hiking Trails

আমার ব্যবহার করা অফট্রেইল হাইকিং কিংবা ট্রেকিংয়ে ন্যাভিগেশনের জন্য সবচেয়ে ভাল আর উপকারি অ্যাপ্লিকেশন হল ViewRanger। অন্য যেকোন অ্যাপসের তুলনায় এই অ্যাপটি প্রায় নির্ভুল তথ্য দিতে পারে এবং যথেষ্ট ইউজার ফ্রেন্ডলি। অফরোড ট্রেইলে হাইকিং বা ট্রেকিংয়ের জন্য ম্যাপে/জিপিএস ডিভাইসে যা যা দরকার তার সবকিছুই আছে এই অ্যাপসটিতে। অ্যাপটি চালানোর জন্য কোন ইন্টারনেটের প্রয়োজন পড়েনা কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্কও লাগে না। শুধুমাত্র ফোনের জিপিএস অন থাকলেই হল। সাতটি অনলাইন ম্যাপ থেকে আপনার পছন্দের ম্যাপটি চাইলেই আপনি ডাউনলোড করে নিতে পারবেন কিংবা পারবেন ফোনের ক্যাশে (cache) মেমরিতে সেভ করে রাখতে। নিজের বানানো ট্রেইল বা অন্যের বানানো কোন gpx বা kml ফাইলটি ফোনে লোড করে নিয়ে সহজেই অ্যাপটির মাধ্যমে আপনি ট্রেইল অনুসরণ করতে পারবেন। আর সব ট্রু জিপিএস ডিভাইসের মত এই অ্যাপসটি আপনার অবস্থানসহ গ্রিড রেফারেন্স, আপনার অবস্থানে সূর্যোদয় – সূর্যাস্তের নিখুঁত ভৌগোলিক হিসাবও দেখায়। অ্যাপটি আপনাকে বলবে  আপনার অবস্থান থেকে আপনি কি গতিতে চলছেন, আপনার এলিভেশন প্রোফাইল, কতখানি দূরত্ব পার করলেন আর কতখানি যেতে হবে, আছে পয়েন্ট অফ ইন্টারেস্ট (POI) যোগ করা, অল্টিচিউড গেইন/লস সহ আরো অনেক ফিচার! সেটিংস থেকে কাস্টমাইজ করে নিতে পারবেন আপনার পছন্দমত।

ট্র‍্যাক অনুসরণ করার পাশাপাশি আপনি চাইলেই আপনার ট্রেক রেকর্ড করতে পারবেন অ্যাপসটির মাধ্যমে। আর তা শেয়ার করতে পারবেন অন্তর্জালে। অ্যাপসটি বিংয়ের এরিয়াল ইমেজারি ব্যবহার করে যা একটু পুরোনো। এই একটিই অসুবিধা এই অ্যাপ্লিকেশনটির। গুগল আর্থ ডাউনলোড করে দুইটি ম্যাপ মিলিয়ে নিলেই এই অসুবিধাটি আর থাকে না। ইন্টারনেট সংযোগ প্রয়োজন হয় কেবল অনলাইন ম্যাপ ডাউনলোড কিংবা ক্যাশেতে (cache) জমা করতে। আমি সাধারণত ক্যাশেতেই জমা করে রাখি। তাতে জায়গা, সময় দুইটাই বাঁচে।

[২] Back Country Nav Topo Maps GPS

হাইকারদের জন্য BCN (Back Country Navigation) অন্যতম একটি উপকারি ন্যাভইগেশন অ্যাপ্লিকেশন। তবে View Ranger এর মত এপ্লিকেশনটি ফ্রি না। এটি একটি পেইড অ্যাপ। ফ্রি ভার্শনটিও ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু সেটিতে অফলাইন ডাউনলোড কিংবা ক্যাশে মেমরিতে সেভ করার কোন অপশন থাকবে না। বেশ কয়েকটি ম্যাপ যেমন টপোগ্রাফিকাল ম্যাপ, ওপেনস্ট্রিট সাইকেল ম্যাপ কিংবা এরিয়াল ইমেজারি ম্যাপ থেকে আপনার পছন্দসই যেকোন ম্যাপ চাইলেই ব্যবহার করতে পারবেন। নিজের বানানো ট্রেইল বা অন্যের তৈরি করা কোন .gpx বা .kml ফাইল লোড করে নিয়ে সহজেই তা অনুসরণ করতে পারবেন অ্যাপসটির মাধ্যমে। বিল্ট ইন কম্পাস থাকার কারণে খুব সহজেই দিক নির্ণয় করে নিতে পারবেন। অন্যান্য জিপিএস/ন্যাভিগেশন এপ্লিকেশনের তুলনায় BCN-এ ম্যাপের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। ব্যক্তিগতভাবে এপ্লিকেশনটির ইউজার ইন্টারফেস আমার কাছে একটু জটিল মনে হয়। অ্যাপসটি মূলত আগে থেকে তৈরি করা ট্রেইল/ট্র‍্যাক অনুসরণ করার জন্য বেশি সুবিধাজনক। যে কয়টি ন্যাভিগেশন এপ্লিকেশন ফ্লাইট বা এরোপ্লেন মোডে ব্যবহার করা যায়, BCN তার মধ্যে একটি। ফিচার ViewRanger এর তুলনায় কিছুটা কম হলেও বেশ উপকারি এবং দরকারি একটি এপ্লিকেশন হল এই BCN।

আরও পড়ুন 
অভিযান-অভিযাত্রী-মানচিত্র (১ম পর্ব)
অভিযান-অভিযাত্রী-মানচিত্র (২য় পর্ব)

[৩] AlpineQuest

ন্যাভিগেশনের জন্য আরেকটি উপকারি অ্যাপ্লিকেশন হল AlpineQuest। BCN-এর মতই এই অ্যাপ্লিকেশনটিও কিনে ব্যবহার করতে হয়। যথেষ্ট ইউজার ফ্রেন্ডলি এবং অনেকগুলি অনলাইন ম্যাপ রয়েছে এই এপ্লিকেশনটিতে; যা পরবর্তিতে অফলাইনে ব্যবহারযোগ্য। ভিউরেঞ্জার এবং ব্যাককান্ট্রি ন্যাভিগেশনের মতই AlpineQuest- এও রয়েছে রুট ফলো এবং রুট তৈরি করার সুবিধা।

কয়েকটি ফিচার রয়েছে এই এপ্লিকেশনটিতে যা একে অন্য সব এপ্লিকেশন থেকে আলাদা করে রেখেছে। তার মধ্যে একটি হল ম্যাপ ওভারলে। এই ফিচারটির সাহায্যে সহজেই দুইটি আলাদা আলাদা ম্যাপ একটির উপর আরেকটি রেখে ব্যবহার করা যায়। কেউ চাইলেই একটি টপোগ্রাফিকাল ম্যাপকে বেজ ম্যাপ বানিয়ে স্যাটেলাইট ইমেজারি ম্যাপকে বেজ ম্যাপের উপরে বসিয়ে নিতে পারে। দুইটি ম্যাপের ট্রান্সপারেন্সি আলাদা আলাদা নিয়ন্ত্রণ করা যায় যার ফলে খুব সহজে অনেক বেশি তথ্য একসাথে পাওয়া যায়।

অ্যাপ্লিকেশনটির আরেকটি ব্যতিক্রমী ফিচার হল ম্যাপগুলি ডিরেকশনাল ওরিয়েন্টেশনের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়। এই ফিচারটি অন করলে আপনার অবস্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে ম্যাপের অবস্থানেরও পরিবর্তন হবে। ম্যাপে আপনার লোকেশন দেখানোর সাথে সাথে আপনার অবস্থান পরিবর্তন হলে ম্যাপটিরও দিকের পরিবর্তন হবে। যার কারণে ইচ্ছা হলেও হারানোর কোন ভয় নেই!

এই তিনটি অ্যাপটিসের মধ্যে কেবল এই অ্যাপসটিতে গুগল স্যাটেলাইট ম্যাপ ব্যবহার করা যায়। কিন্তু কোন এক কারণে গুগলের স্যাটেলাইট  ম্যাপটিতে কোন স্থানের নাম দেখা যায় না যা ম্যাপটিকে অকেজো করে দিয়েছে। তাছাড়া এই অ্যাপটি আপনাকে Digital Elevation Model(DEM) ম্যাপ ব্যবহার করতে দেয় যার ফলে SRTM/ASTER থেকে এলিভেশন ডেটা পাওয়া যায় । ফলে এলিভেশনগুলি আরো নিখুঁত পাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে।

 [৪] Google Earth

অফলাইনে ব্যবহারের জন্য না হলেও এটি একটি অত্যন্ত দরকারি এবং গুরত্বপূর্ণ অ্যাপ্লিকেশন।  নতুন কোন ট্রেইল বানানোর জন্য বা কোন নতুন অফরোড প্ল্যানের জন্য গুগল আর্থের কোন বিকল্প নেই। অন্য যেকোন ম্যাপের তুলনায় গুগল ম্যাপ অনেক বেশি আপডেটেড থাকে সবসময়। নতুন কোন জায়গা সম্পর্কে ভাল ধারণা পাওয়ার জন্য গুগল আর্থ বা গুগলে ম্যাপ অত্যন্ত দরকারি একটি অ্যাপ্লিকেশন। খুব সহজেই যেকোন জায়গার মোটামুটি নির্ভুল তথ্য গুগল ম্যাপের দ্বারা পাওয়া সম্ভব। অন্য যেকোন ন্যাভিগেশন অ্যাপ্লিকেশনের সাথে গুগল আর্থটিও ফোনে ইন্সটল করে রাখতে পারেন। গুগল আর্থের ম্যাপকে রেফারেন্স ধরে নিয়ে প্ল্যান বানাতে পারেন। তারপর আপনার পছন্দের অ্যাপ্লিকেশনে পছন্দের ম্যাপের সাথে মিলিয়ে নিতে পারেন এবং তৈরি করতে পারেন নতুন কোন ট্রেইল।

ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে গুগল আর্থের একেবারে যে নতুন ভার্শনটি বের করেছে তা আমার কাছে খুব বেশি ইউজার ফ্রেন্ডলি মনে হয়নি। ঠিকমত পাওয়া যায়না অনেককিছুই। গুগল আর্থ 9.2 ভার্শনের তুলনায় 8.0.4 ভার্শনটা যথেষ্ট  ইউজার ফ্রেন্ডলি।

স্মার্টফোনের সকল জিপিএস/ন্যাভিগেশন এপ্লিকেশনের এক্যুরেসি নির্ভর করে ফোনের জিপিএস সেন্সরের উপর। স্বাভাবিকভাবেই একটু দামি ফোনগুলোতে এক্যুরেসি তুলনামূলক ভাল হয়।সব জিপিএস ডিভাইসই স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করে ফলাফল দেয়। এ কারণে যেখানে স্যাটেলাইট সিগনাল পাওয়া সহজ সেখানে এক্যুরেসি তত বেশি পাওয়া যায়। এই জিপিএস এপ্লিকেশন গুলো কোন পাহাড়ি উপত্যকা কিংবা ঘন জঙ্গলের মধ্যে অনেক সময় কিছুটা ভুল তথ্য দেখাতে পারে। যদিও তা খুবই সামান্য। আপনার যদি ম্যাপ সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা থাকে, ম্যাপ দেখে যদি চিনতে পারেন কোনটা পাহাড়ি ঢাল, কোনটা উপত্যকা বা কোনটা খাল তাহলে এই বিচ্যুতিগুলি খুব একটা সমস্যা করার কথা না। নিজে থেকে বুঝে যাবেন কিভাবে কোনদিকে যেতে হবে। আর বেশিরভাগ অ্যাপ্লিকেশনের কম্পাস থাকে যেটি আপনার ডিভাইসের ম্যাগনেটিক সেন্সরের উপর নির্ভর করে দিক প্রদর্শন করে থাকে। অনেক সময় এই কম্পাসকে ক্যালিব্রেট করে নিতে হয়। আর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল অ্যাপ্লিকেশন আপনি যেটিই ব্যবহার করেন, নিজে থেকে অ্যাপ্লিকেশনটির খুঁটিনাটি সব বিস্তারিত জেনে নেওয়া ভাল।

তাহলে আর দেরি কেন! আজই পছন্দের এপ্লিকেশনটি ইন্সটল করে বেরিয়ে পড়ুন অজানার উদ্দেশে। হারিয়ে যান প্রকৃতির বিশালতায়। সাথে পাওয়ার ব্যাকআপ নিতে ভুলবেন না যেন।

(Visited 1 times, 1 visits today)
তানভীর রিশাত
তানভীর রিশাত
মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিষয় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছেন। ইচ্ছামত ঘুরে বেড়ানো, বই পড়া, পাহাড়ে যাওয়া তার শখ। স্বপ্ন সারা পৃথিবী ঘুরে ঘুরে দেখার।

৩ thoughts on “ন্যাভিগেশন সহজ করার ৪ টি কার্যকরী অ্যাপস

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)