দাগিঘাড় কুটিপেঁচা


পাহাড় আমার বরাবরই ভালো লাগে। আকাশ ছোঁয়া গাছ, পাহাড়ের পিঠে পাহাড়, ভেলার মত মেঘ, অচেনা অজানা কিছুর ভয় আর উঁচু-নিচু পথ দিয়ে ভয়ানক সব বাঁক; এইতো পাহাড়। এর আগে দুইবার মুন্না ভাইয়ের সাথে যাওয়া হয়েছিল কির্স তংয়ের জঙ্গলে। এবারো মুন্না ভাইয়ের সঙ্গে সেখানেই যাব বলে মনস্থির করলাম। এপ্রিল মাসের শেষ বলে গরমের কথাটা মাথায় ছিল। পাহাড়ের গরম আবার বেশ ভয়ানক।

প্রথম দুইদিন তেমন কোন পাখির সন্ধান পাচ্ছিলাম না। তাই তৃতীয় দিন আমরা ঠিক করলাম একটা জায়গায় বেশ কিছু সময় বসে থাকবো আর নতুন কোন পথ বেছে নিব।

কথা মত ভোরে বেরিয়ে একটা ক্যানপি দেখে বসে পড়লাম দুজনেই। দুপুরের আগে করে হঠাৎ চোখে পড়লো খুব ছোট একটা পাখি, সে এক ডাল থেকে এক ডালে উড়ে গিয়ে বসলো।

একটা পেঁচা !

চিন্তা করলাম পেঁচা এতো ছোট কি করে হয়! দেখলাম, সে একটা আস্তো গিরগিটি ধরে নিয়ে এসেছে। গাছের পাতার জন্য আলো খুব কম থাকায় ক্যামেরার আইএসও অনেক বাড়িয়ে বেশ কিছু ছবি তুললাম। কোথায় যেন হঠাৎ আবার হারিয়েও গেল।



প্রায় আধা ঘন্টা পর আবার দেখা। এবার আরো অবাক হলাম তার শিকার দেখে। আস্তো একটা ধলাকোমর মুনিয়া (White-rumped Munia) ধরে নিয়ে এসেছে সে। আমরা দুজন দুজনার দিকে অবাক হয়ে তাকালাম। নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না যেন। একদম কাছেই আমরা তার বাসা পেলাম। ঠিক মাথার ওপরে একটা গাছের কোঠরে সে বাসা বানিয়েছে। আরো কিছু সময় পর সে একটা অঞ্জলি (Skink) ধরে নিয়ে এলো। আমরা কিছুটা নিশ্চিত ছিলাম এই সেই দাগিঘাড় কুটিপেঁচা যার ডাক অনেকেই শুনেছেন পাহাড়ে এসে। নাহ এইবার বলতেই হয় দিনটা বেশ ছিল।

ছবি দেখে এই পেঁচা চেনার একমাত্র উপায় হচ্ছে এর মাথার পেছনের ছবি। কারণ এর ঘাড়ের পেছনে একটি নকল মুখ-অবয়ব আছে। যা দেখলে যে কেউ এর মুখ ভেবে ভুল করতে পারে ।

দেশের পাহাড়ে এই পেঁচার ডাক অনেকেই শুনেছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে এর ছবি তোলা সম্ভব হয় নি। ভাবতে ভালো লাগছে এইবারই একে প্রথম ক্যামেরাবন্দী করা গেল। নাম তার দাগিঘাড় কুটিপেঁচা (Collared Owlet)। বহুদূর  থেকে এর ডাক শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু ডাক শুনে একে খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন কাজ। কারণ ডাক দেয়ার সময় এই পাখি মাথা খুব দ্রুত নাড়তে থাকে, যার ফলে গাছের মধ্যে এর স্থান নির্ধারণ করা খুব একটা সহজ নয়।



এশিয়ার সবথেকে ছোট পেঁচা হল এই কুটিপেঁচা। মাত্র ১৫ সেন্টিমিটার। বাংলাদেশ সহ আফগানিস্তান, ভুটান, ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, চায়না, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালেশিয়া, মায়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের নাতিশীতোষ্ণ বনে একে পাওয়া যায়। বিশ্বে এর অবস্থান তেমন ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবে চিরহরিৎ বনে গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে বলে এদের সংখ্যাও দিন দিন কমছে। সাধারণত চিরহরিৎ বনের গাছের কোঠরে বা ফাঁপা জায়গায় এরা বাসা বানায়। মাঝে মাঝে কাঠঠোকরার বা বসন্তবউরির বাসায়ও এরা বাসা বানিয়ে থাকে।

হিমালয় অঞ্চলে এদের প্রজনন সময় মার্চ থেকে জুন, সাধারণত এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত হয়ে থাকে। মেয়ে পাখিটি ছেলে পাখির চেয়ে আকারে কিছুটা বড় হয়ে থাকে। মেয়ে পেঁচা ৩-৫টি ডিম দেয়। রাতের পাশাপাশি এরা দিনেও শিকার করে। সাধারণত নানা ধরনের ছোট পাখিই এদের প্রধান খাবার। এই কুটিপেঁচা এর সমান পাখি ধরে ফেলতে পারে। আমরা ধলাকোমর মুনিয়া (প্রায় ১২ সেন্টিমিটার) ধরে আনতে দেখেছিলাম। এছাড়া ইঁদুর, গিরগিটি, ফড়িংসহ ছোট পোকামাকড় খেয়ে থাকে।


 

(Visited 1 times, 1 visits today)
সাহাদ রাজু
সাহাদ রাজু
পাখি পর্যবেক্ষক

২ thoughts on “দাগিঘাড় কুটিপেঁচা

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)