তাজিং ডংয়ের আশেপাশে


[১]

দিনভর গরম পড়েছে। প্রথমে লক্কড় ঝক্কর একটা বাস, তারপরে উচুঁ-নিচুঁ পাহাড় আর চড়া রোদ। খুব একটা আনন্দঘন পরিবেশ না। ঘণ্টা দুই হাঁটার পর বৃষ্টি ঝেঁপে এলে দিলখোশ হয়ে গেল। বোর্ডিং পাড়ার দিকে যাচ্ছি। বৃষ্টি আর বাজ পড়ার শব্দ, পানির পর্দায় ঢাকা ঝাপসা পাহাড়, উচুঁ উচুঁ গাছের মাথা দুলতে দেখে ক্লান্তি চলে যায়। একটা গিরিখাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গাছে দু’টো কালিজ ফেজেন্ট (মথুরা) বসে থাকতে দেখে খুব কায়দা করে বৃষ্টির মধ্যেই ক্যামেরাটা বের করতে গিয়েছিলাম। তাতে ফল হয়েছে এই যে দুটো পাখি উড়ে নিচের খাদে নেমে গিয়েছে।

সন্ধ্যার আগে আগে বোর্ডিং পাড়া দৃষ্টিসীমায় এল। ভিজে সপসপে জামা কাপড় শুকাতে পারবো ভেবে আহ্লাদ লাগছিল। গাছ কেটে জায়গাটা ফাঁকা করে দেওয়া হয়েছে দেখলাম। বিরাট বিরাট গুড়ি পড়ে রয়েছে। শেষপ্রান্তে একটা বাশঁ-কাঠ জোড়াতালি দেওয়া নড়বড়ে সিড়ি বা মই গোছের কিছু বানিয়ে রাখা হয়েছে নামবার জন্য। ঐ বস্তু বেয়ে নিচে যখন এলাম, তখন বোর্ডিং পাড়ার পাশের পদ্ম ঝিরি ফুলেফেঁপে ভয়ানক হয়েছে। সাতাঁর জানি না, পাহাড়েও নেহাত আনাড়ি, কয়েক পা এগিয়ে পানির মধ্যেই জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। বৃষ্টি ফুড়ে এক ম্রো যুবক এসে হাজির না হলে বিপদেই পড়তাম। সে আমাকে কিছুটা টেনে, কিছুটা হিঁচড়ে ওপারে নিয়ে গেলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।




বোর্ডিং পাড়া


পাড়াটা বেজায় চুপচাপ। অন্ধকার। হাতড়ে হাতড়ে কারবারী দাদার বাড়ি খুঁজে পাওয়া গেল। ব্যাগ খুলে দেখি জামা-কাপড় সবই জলে ভিজে একশা। চুলোর ওপরে সব মেলে ভেজা কাপড়েই শুতে হল। বাইরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি, সঙ্গী-সাথীদের মৃদু কথা বলার আওয়াজ, বাড়ির নিচের শূকর আর মুরগীদের খচমচ শব্দে ঘুমিয়ে গেলাম।

[২]

কারবারীর স্ত্রীর বোন অসুখে পড়েছে। দিনে দিনে জুম থেকে ফিরে এসেছে বেচারী। আমাদের কাছে কিছু ট্যাবলেট ছিল, দিলাম। খানিক চুপ থেকে আবার কান্নাকাটি। নিরিবিলি জায়গায় কেও যদি একটানা নিচু স্বরে কাদঁতে থাকে তবে সেটা ভয়ানক চাপ দেয় মাথায়। বাইরে বৃষ্টির মধ্যে একটা হরিণ যে কর্কশ স্বরে ডাকছে সেটা অনেকক্ষণ মাথাতেই আসেনি।

গভীর অন্ধকার ভেদ করে হাজির হল এক ম্রো গুণিন। পরনে কৌপিন গোছের একটা পোশাক; দং। বয়স হয়েছে গুণিনের, কিন্তু দেহখানা যেন পাথর কুঁদে তৈরি। তেল চকচকে চুল মাথার ওপরে চুঁড়ো করে বাঁধা। বুড়ো এসে জোরালো তন্ত্র-মন্ত্র আওড়াতে লাগলো। সঙ্গে বাশেঁর একটা খাঁচা নিয়ে এসেছে দেখলাম। ছোট্ট খাঁচা। খানিক পরে অসুখটা খাঁচায় পুরে গুণীন বাইরে চলে গেল। মেয়েটা দিব্যি চুপচাপ।

ওদিকে নেফিউ পাড়া থেকে কয়েকজন অতিথি এসেছে। গৃহকর্তা অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত। ম্রোরা দিব্যি মেলামেশা করে, কিন্তু ছবি তুলতে তাদের বেজায় আপত্তি। অতি আগ্রহীরা পূর্বে ঝামেলা পাকিয়ে থাকলে এমন মনোভাব অস্বাভাবিক কিছু নয়। বাড়ির সবাই ছবি তোলার ব্যাপারে বেজায় বিরক্ত দেখলাম। তাছাড়া ম্রোরা যে গল্প জুড়েছে তাও কম আকর্ষক ছিল না। কাছের কোন এলাকায় নাকি তারা আঠারো ফুট লম্বা এক সাপ দেখেছে। যে লোকটি সেটা মেরেছে সে নাকি নিজেও সাপের কামড় খেয়ে মরেছে। আড্ডার ধরণ সব জায়গাতেই একরকম। কাজেই সত্য মিথ্যা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে তাদের ভিন ভাষার আলাপ শুনতে লাগলাম। দেবতা থুরাইয়ের এই অনুসারীদের গায়ের রঙ কিছুটা শ্যামলা, শক্ত-সমর্থ। তাদের ছিয়াছত প্লাই উৎসবের কথা জানতাম, কিন্তু সেটা ডিসেম্বরের পরে হয়।

[৩]

যখন রোদ ছিল তখন ছড়ার পাশের পাথরের ওপরে বসে কাপড় শুকোচ্ছিলাম। কয়েকটা বিচ্ছু গোছের বাচ্চা এসে চড়াও হল। ধস্তাধস্তি করে তারা বিদায় নিলে পরে আবার বসে বসে ঝিমাতে লাগলাম। খানিক পরে আশেপাশের পাহাড়ের মাথায় বিকালের সোনালী আলো এসে জমা হতে থাকল। ঝিরির পাশের জঙ্গল থেকে পোকামাকড়ের আওয়াজ আর পানির শব্দ মিলে তখন খুবই উচ্চাঙ্গের পরিবেশ। আর এমন সময়ে পাড়া থেকে ঝিরিতে এসে নামলেন এক বৃদ্ধা। পরনে ম্রোদের প্রচলিত পোশাক। পিঠে একটা বাচ্চা ঝুলছে। দিদিমার হাতে লাঠি, কুজো হয়ে হাঁটছেন পানির মধ্যে। একসময় ছড়া পার হয়ে ওপাশের জঙ্গলে মিশে গেলেন।

পরের দিন শেরকর পাড়ায় যাওয়ার কথা আমাদের। কটকটে রোদের মধ্যে বেরিয়ে বেজায় বিরক্ত লাগছিল। ভ্যাপসা একটা জঙ্গল পার হয়ে আমরা একটা মস্ত পাহাড়ের পাদদেশে এসে জুটলাম। এই পাহাড়টার ওপাশেই তাজিং ডং।


শেরকর পাড়ার রাস্তায়


গোটা পাহাড় জুড়েই জুম চাষ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও এখনো পোড়া গাছের গুড়ি দেখা যায়। এদিক সেদিক কিছু বড় বড় গাছ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আর আছে মস্ত মস্ত সব পাথরের খণ্ড। পাশের জঙ্গলাবৃত পাহাড়ের মাঝে একটা ছোট্ট ঝর্ণা। আমাদের পেছনে একসারি পাহাড় দেখা যাচ্ছে। যতই ওপরে উঠতে থাকি ততোই হাওয়া বাতাস বাড়তে থাকে। অল্প স্বল্প বৃষ্টি। একদম ওপরে যখন পৌঁছালাম তখন আমাদের সামনে ভেসে উঠলো আরো উঁচু উঁচু একসারি পাহাড়। বায়ে তাজিং ডং, সামনে বেশ নিচে শেরকর পাড়া। উঁচু উঁচু গাছে ঘিরে রয়েছে। পাহাড়ের চূড়ার গাছপালার ধরণ একটু ভিন্ন। খসখসে এবং কাটাভর্তি ঝোপঝাড়ে ভর্তি। এরই মধ্য দিয়ে নেমে শেরকর পাড়ায় পৌঁছালাম একসময়। পাড়ার প্রবেশপথের বাড়িটাই কারবারীর। কারবারী স্বয়ং একটা লাল হাফপ্যান্ট পরে মিষ্টি হাসি দিচ্ছে। সময়টা বর্ষাকাল হওয়া বেজায় জোঁকের উৎপাত ছিল। কারবারিকে সে কথা বলতেই সে ভীষণ খুশি হয়ে মাথা নাড়তে লাগলো। মজার বুড়ো।


পাহাড়ের উপরে


[৪]

পাড়ার পাশে একটা টিলার ওপরে স্কুল। একটা কুকুর বারান্দায় শুয়ে। পাহারাদার বোধহয়। আকাশে চাঁদ ছিল, কিন্তু মেঘের কারণে সেটা দেখা যাচ্ছে না। বহুদূরের পাহাড়গুলোর মাথা আচঁ করা যায় শুধু। পরদিন সিম ত্ল্যাং পি যাওয়ার পায়তারা করছিলাম। শেরকর পাড়ার বাসিন্দারা বম, ধর্মে খ্রিস্টান।

এদিকে পাড়ার সওদাগর সেদিন ম্যালেরিয়াতে ভুগে মারা গিয়েছে। পরেরদিন যখন কারবারীর বারান্দায় বসে বহুদূরের পাহাড়ের একটা জুম ঘরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তখন দেখলাম একদল ছেলে-বুড়ো বড় একটা পাথরের ফলক বয়ে নিয়ে আসছে। সমাধি স্তম্ভ। বেজায় ভারী। এক বেচারা কাদায় বেমক্কা আছাড় খেল পর্যন্ত। সারাদিন ধরেই বৃষ্টি, কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। পাড়ার একমাত্র সওদাগর মৃত তাই কোন কিছু কেনারও উপায় নেই। আগের দিন রাতে ঢোল জাতীয় কোন বাদ্যযন্ত্র নিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত প্রার্থনা করেছে সবাই। বৃষ্টির কারণে আমরা সিম ত্ল্যাং পি যাওয়াটা আগামী দিন পর্যন্ত পিছিয়ে দিলাম। বোর্ডিং পাড়ার সেই ভয়ানক ঝিরি নাকি আর পার হওয়ার উপায় নেই। পাড়ার কয়েকজন যেয়ে আবার ফিরে এসেছে। সোজা কথায় আটকা পড়েছি এবং বৃষ্টির কারণে এই বন্দীত্বটা মোটেও উপভোগ্য হচ্ছিল না।


সমাধিস্তম্ভ বয়ে আনা হচ্ছে


শীতকালে এই এলাকায় গাড়ি আসে। আসবার সময় মাটির রাস্তা দেখে এলাম। মোটা মোটা গাছগুলি সাবাড় করে দেওয়ার উত্তম ব্যবস্থা। এভাবে চললে হরিণ বা বন্য শূকরের মত প্রাণী যে বেশিদিন টিকবে না তা অনুমান করবার জন্য জ্যোতিষী হওয়ার প্রয়োজন হয় না।

[৫]

জোঁক যে কি ভয়ানক জিনিস সেটা বান্দরবানের পাহাড়ে বর্ষাকালে না ঢুকলে বোঝানোর উপায় নেই। হাতে, পায়ে, মাথায়, পাশের ঝোপে বা ঝিরির পাশের পাথরে, সব জায়গাতেই জোঁক ঘুরঘুর করছে। ভ্যাপসা জঙ্গল পার করে একটু খোলা জায়গা পেয়ে স্বস্তি। এদিকে সরু রাস্তাটা পানিতে ছপছপ করছে। দুপাশে উঁচু উঁচু ঘাস, দমকা বাতাসে শীত করছে। ঝোপের মাঝে ঝটপট শব্দ শুনলে অন্যসময় হয়তো হা করে তাকিয়ে থাকতাম পাখিটা দেখবার জন্য, কিন্তু এখানে তার উপায় নেই। দাঁড়াতে গেলেই জোঁক এসে হাজির হচ্ছে। পথের মধ্যে সামনে পড়লো দুয়েকটা গয়াল। এরা হচ্ছে গৃহপালিত গরু আর বন্য গরু বা গৌরের শংকর। বন্য গরু এখন পাহাড়ে বিরলতম প্রাণী। তবে বনচারী সেই আত্মীয়দের মত গয়ালদের পাগুলোও হাঁটুর নিচ থেকে সাদা। গায়ের রঙও প্রায় এক। মেঘে ঢাকা পথের দু’পাশ থেকে মাঝেমধ্যে উকিঁ দিচ্ছে মস্ত মস্ত সব গাছ। একটা ঝর্ণা পাহাড় বেয়ে নেমে এসেছে, পথটা কেটে ঢুকে গিয়েছে গভীর কোন গিরিখাদে। এসবের মধ্য দিয়েই চলতে চলতে একসময় সিম ত্ল্যাং পি পাড়া নজরে এল।


সিম ত্ল্যাং পি পাড়ার পথে


বৃষ্টি, বাতাস আর মেঘের কল্যাণে গোটা পাড়াটায় একটা স্যাঁতস্যাঁতে ভাব। ছুরি দিয়ে একটা জোঁক ছাড়াতেই একগাদা রক্ত বেরিয়ে এল। সেটা দেখে প্রয়োজনমত আহা উহু করে, লাউয়ের খোল দিয়ে গোসল সেরে রান্নাঘরে থিতু হলাম। একখানা চালকুমড়ো ছাড়া কোন খাবার পাওয়া যায়নি। রান্নাঘরের বাঁশের দেয়ালে ঝুলছে মস্ত ছুরি, শূকরের মাথা, মথুরা এবং আরো কয়েকটা নাম না জানা পাখির পালক। বর্ষাকালে কেও শিকারে বেরোয় না অবশ্য। কারবারী, অন্ধ এক বৃদ্ধা, তাগড়া দুটো কালো কুকুর এবং একটা ভীতু গোছের বেড়াল ছাড়া আর কোন প্রাণী চোখে পড়লো না। শূকরগুলো পর্যন্ত আজ বের হয়নি।


আরও পড়ুন
পাহাড় বড় আশ্চর্য জায়গা 
পাহাড়, অরণ্য ও অরণ্যশূণ্যতা


বড় যে ঘরটাতে আমরা ছিলাম তাতে একটা খাট ছিল বলে রক্ষা। মেঝেটাও ঈষৎ ভেজা। জানলা দিয়ে দেখলাম বাইরে ঝড় তখনো শনশনাচ্ছে, বিরাটকায় গাছগুলো নুয়ে পড়লেও হাল ছাড়ছে না। কারবারীর বাসার পেছনদিকে, পাহাড়ের গা বেয়ে আরো কয়েকটা ঘর চোখে পড়লো। বৃষ্টি আর শীতের দাপটে গোটা এলাকা নিঝুম হয়ে রয়েছে। জোঁকের ভয়ে কানে হেডফোন গুঁজে ঘুমাতে হল। পরদিন ফেরার পথ ধরবো।

(Visited 1 times, 1 visits today)

৬ thoughts on “তাজিং ডংয়ের আশেপাশে

  1. অবশেষে তোর তাজিংডং যাওয়া হল। গ্রেট! লেখাটার মধ্যে আগের অমর্ত্যকে ঠিকমত পাইনি কিন্তু! ফিরিয়ে আন ব্যাটা! আর জোঁকের ব্যাপারটা বেশ ভালই উপভোগ করছিস তাইলে বুঝা যায়! 😜 আরও লেখা চাই।

  2. এক চুমুকে পড়ে ফেললাম। যতই পড়ছি ততই মনে হচ্ছে শেরকর পাড়ার সেই অতি পরিচিত রাস্তা দিয়ে হাটসি, হারিয়ে যাচ্ছি তাজিংডং, কেওকারাডং, সাকাহাপং এর অলিগলিতে…….!

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)