জার্জি কুকোজকা: এক লড়াকু পর্বতারোহী

এক.

২৪ অক্টোবর ১৯৮৯। পৃথিবীর চতুর্থ সর্বোচ্চ পর্বত লোৎসের ওয়েস্ট ফেস দিয়ে আরোহনের চেষ্টা করছিলেন জার্জি কুকোজকা। চূড়ার ঠিক ৩০০ মিটার নিচে থাকা অবস্থায় হঠাৎ তার ক্লাইম্বিং রোপ ছিড়ে যায়। গড়িয়ে পরে যান ২০০০ মিটার গভীর খাদে। সমাপ্তি ঘটে কিংবদন্তী এক পর্বতারোহীর জীবন অধ্যায়ের।

জার্জি কুকোজকা, পরিচিত মহলে সবাই যাকে চিনতো জুরেক নামেই। পর্বতারোহনকে নতুন মাত্রা দিয়ে ‘অ্যাল্পানিজম’ শব্দটাকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। পোলিশ এই পর্বতারোহীর মৃত্যু পুরো পর্বতারোহন জগতের জন্য ছিল নিদারুন শোকের।




তাঁর মৃত্যুর ধরণ ও কারণ নিয়ে হয়েছে নানারকম ব্যবচ্ছেদ। কাঠমন্ডু থেকে কেনা পুরোনো দড়ি এমন এক অভিযানে ব্যবহার নিয়েও হয়েছে বিস্তর সমালোচনা। তবুও তার জীবন অধ্যায়ের দিকে ফিরে তাকালে এমন ঝুঁকি নেওয়ার উদাহরণ মেলে অসংখ্য। গতানুগতিক ও চ্যালেঞ্জবিহীন সহজ পথ তাঁকে টানতো না। আপাত অসাধ্য ও দুর্গম পথে শিখরে ওঠার চ্যালেঞ্জ অমোঘ তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকত।

তাঁর এই সর্বশেষ অভিযানের কথাই ধরা যাক। ১৯৭৯-১৯৮৭ মাত্র আট বছরের মধ্যে কুকোজকা ১৪টি আট হাজার মিটার চূড়া আরোহন করে ফেলেছেন। এই কৃতিত্ব অর্জনে জনপ্রিয় পর্বতারোহী রেইনহোল্ড মেসনারের পর তিনিই দ্বিতীয় ব্যক্তি। সাফল্যের শিখর বলতে যা বোঝায় পর্বতারোহনে, তিনি আক্ষরিক অর্থেই সেখানে অবস্থান করছিলেন। সবার আগে সবগুলো  আট হাজার মিটারের পর্বত আরোহণে মেসনারের কাছে পিছিয়ে গেলেও জুরেকের এই বিষয়ে দর্শন ছিল একেবারেই আলাদা ও অনন্য সাধারণ। তিনি শুধু এই পর্বতগুলোতে আরোহণই করতে চাননি, এমনভাবে আরোহণ করতে চেয়েছেন যা অন্য রকম এক মাইলফলক তৈরি করবে। আর তিনি করেছেনও তাই। ১৪ টি আট হাজারি পর্বতে হয়ত সম্পূর্ণ নতুন ও দূরহ রুট নয়ত শীতকালে প্রতিকূল পরিস্থিতি আরোহণ করেছেন। আর এর জন্য তিনি নিয়েছেন মেসনারের চেয়ে প্রায় অর্ধেক সময়।


লোৎসের সাউথ ফেস আরোহণ করতে গিয়ে নিহত পর্বতারোহীদের স্মৃতির উদ্দেশে বানানো সৌধ/ ছবি: Surendra Pai


লোৎসে পর্বতের চূড়ায় তিনি প্রথম আরোহণ করেন ১৯৭৯ সালেই। এটাই তাঁর আরোহণ করা প্রথম ৮০০০ মিটার চুড়া ছিল। ১৪ টি আট হাজারী পর্বতের পুরো কোটা পূরণের পরও কেন এই লোৎসের কাছে আবার ফিরে আসা? এমন প্রশ্নের জবাবে তার দ্বিধাহীন উত্তর ছিল, ‘এতো দ্রুত শেষ টানবোই বা কেন যখন সবকিছুই এতো ভালো চলছে!’

তাঁর উত্তরের মতোই অকপট ছিল নিজের জীবন। তাঁর কাছে পর্বতারোহণ কোন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ছিল না। পর্বতারোহণ ছিল বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় প্রেরণার নাম। তাই তিনি বারবার ফিরে এসেছেনে একই পর্বতের কাছে ভিন্ন পথে, ভিন্ন উপায়ে। নিজেকে অবনত শিরে সমর্পণ করেছেন পর্বতের আশ্রয়ে।

আসলে শেষ ১০ বছরের কুকোজকা নিজের এক অনন্য স্টাইল প্রতিষ্ঠিত করেছেন। লোৎসে ব্যতীত বাকি ১৩ টি আট হাজার মিটার পর্বতে তিনি আরোহণ করেছেন তার নিজস্ব ভঙ্গিমায়। সম্পূর্ণ নতুন কোন অচেনা ও বিপদজনক কোন রুটে, কৃত্রিম অক্সিজেনের ব্যবহার ব্যতীত নয়তোবা শীতকালের প্রতিকূল পরিবেশে। একক ব্যক্তি হিসেবে সর্বোচ্চ দশটি নতুন রুট প্রতিষ্ঠা করেছেনে হিমালয়ে। একমাত্র লোৎসে যেন তার এই অনন্য ক্যাটাগরিতে মিলছিল না। তাই প্রথম প্রেম লোৎসে’র কাছে তিনি আবারো ফিরে এসেছিলেন ১৯৮৯ সালে। সম্পূর্ণ নতুন এক রুট সাউথ ফেস দিয়ে এই পর্বতের শিখরে আরোহণের তীব্র ইচ্ছা নিয়ে।

তাঁর পুরো জীবনটাই এমন সব বিপদজনক ও উচ্চভিলাসী পরিকল্পনা করে এবং তা বাস্তবায়নের চেষ্টায় কেটেছে। কিন্তু কেন তিনি আপাত দৃষ্টিতে অহেতুক এতসব ঝুঁকি নিয়ে একটির পর একটি পর্বত আরোহণ করেছেন? তা বুঝতে চাইলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে তার স্বদেশ পোল্যান্ডের ভৌগলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের দিকে।

 

দুই.

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পোল্যান্ড সাক্ষী হয় মানসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ নির্মমতার। নাৎসি জার্মানী ও সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের মাঝে বৈশ্বিক ক্ষমতার টানাপোড়েনে পোল্যান্ড যুদ্ধের ৬ বছর যাবত জর্জরিত হয়। যুদ্ধ শেষে নিঃশেষিত ও ভঙ্গুর অর্থনীতির পোল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ যায় যুদ্ধজয়ী সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে। পোল্যান্ডের জনগণের ইচ্ছের বাইরে গিয়ে তাদের বরণ করে নিতে হয় চাপিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মডেল। এই শাসন ব্যবস্থায় সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ব। জনগণের আবাস থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান, এমনকি খাদ্য রাষ্ট্র সরাসরি নির্ধারণ করে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে আপাত স্বাধীন দেশেও জনগণের নিজস্ব ইচ্ছা বলতে আলাদা কিছু রইলো না।

অন্যদিকে পৃথিবীর বিরাট অংশ জুড়ে বজায় ছিল পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনৈতিক কাঠামো। সেসব দেশের সম্পদশালী মানুষেরা খাদ্য-বস্ত্রের বাইরেও নিজেদের সাদ-আহ্লাদ পূরণে অর্থ ব্যয়ের বিলাসিতা করতে পারতেন। পর্বরোহণের মতো এমন উচ্চভিলাসী স্পোর্টসে নিজেরা অংশগ্রহণ করতে পারতেন। কিন্তু পোল্যান্ডের জনগণের জন্য তখন তা কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না।

পর্বরোহণের নাগাল পেতে পোল্যান্ডের জনগণের অপেক্ষা করতে হয় সত্তরের দশক পর্যন্ত। ততদিনে সব বড় বড় পর্বত শিখরে পায়ের চিহ্ন পড়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নামী সব পর্বতারোহীর।

পোল্যান্ডের পর্বতারোহীরা অনেক পিছিয়ে থেকেই এই খেলার রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞা কাজ করে যে, হিমালয়ে পোল্যান্ডের পর্বতারোহীরা সম্পূর্ণ অভিনব কিছু করবে। তারা নিজেদের ও দেশের নাম ভিন্নভাবে উপস্থাপন করবে পর্বতারোহণ জগতে।

আর এই সবকিছুর নেতৃত্ব দেন পথিকৃৎ পর্বতাররোহী আন্দ্রে জাওয়াদা। হিমালয়ে প্রথম পোলিশ অভিযান, এভারেস্টের প্রথম শীতাকালীন আরোহণ সবকিছুকেই সামনে থেকে সযত্নে পরিচালনা করেন আন্দ্রে জাওয়াদা। তিনি তার প্রজন্মের পর্বতারোহীদের মাঝে এক নতুন দর্শন প্রবেশ করিয়ে দেন। টাকার অভাবে অভিযান বন্ধ হওয়া যাবে না কোনভাবেই। যা কিছু প্রাপ্য, সহজলভ্য তা নিয়েই কিভাবে কঠিন সব অভিযানগুলো সফল করা যায় তা তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন হাতে কলমে।

আর এর পেছনে কাজ করেছে পোল্যান্ডের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান। পোল্যান্ডের বর্ডার সিল ছিল পুরো সোভিয়েত যুগ জুড়েই। পর্বতারোহীরা চাইলেই বড় কোন পর্বতারোহণ ইন্সটিটিউটে বা পর্বতমালায় গিয়ে নিজেদের প্রশিক্ষিত করা বা ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেতো না। তাই তারা অবিরাম তাদের সীমান্তবর্তী তাতরা পর্বতে (Tatra Mountain) নিজের বিভিন্ন পরীক্ষায় ফেলে দক্ষতার ঝালাই করতেন। আর এভাবে অল্প পরিসরে অনেক পর্বতারোহীর সমাবেশ ঘটায় তাদের মাঝে বোঝাপরার উন্নয়ন ঘটে ভিন্নমাত্রায়। যা তাদের পরবর্তী সমস্ত অভিযানেই খুব বেশি কাজে লেগেছে।



তাতরা পর্বতশ্রেণী/ ছবি: Piotr J


যেহেতু অভিযাত্রীদের কারও চাকরি ব্যাতীত আর কোন আয়ের উৎস ছিল না, তাই প্রতিটি অভিযানের অর্থ-রসদ সংগ্রহ ছিল যেন এক একটা যুদ্ধ। বুট থেকে শুরু করে স্লিপিং ব্যাগ সবকিছুই দেশে তৈরি করা হত স্থানীয় মুচি, দর্জিদের হাতে। বিলাসবহুল পোশাক বা খাবার দাবারের বালাই ছিল না। কয়েকটি সফল অভিযানের পর সরকারী অনুদান যা কিছু মিলত তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তাই প্রতিটি অভিযান ছিল এক একটি চ্যালেঞ্জ। একটি ব্যর্থ অভিযান মানেই পরবর্তী অভিযানে সরকারী অনুদান না মেলার ভয়। তাই পোলিশ অভিযানগুলো পুরো মাত্রায় সফল করার জন্য তারা নিজেদের সবটুকু ঢেলে দিত।

একথা ঠিক যে অভিযানগুলোতে তাদের অর্থ জোগানের ঘাটতি, রাজনৈতিক নানা বিধি নিষেধ পর্বত সমান বাধা হিসেবে কাজ করতো। আবার অন্যদিকে এই অভাব-ঘাটতির বাধা ডিঙিয়েই তারা খুঁজে নিয়েছিলো নিজেদের স্বপ্ন পূরণের বিকল্প পথ। এমনই প্রতিকূল পরিবেশে অ্যাল্পানিজমের চর্চা ও উন্নয়ন ঘটেছিল সর্বোচ্চ মাত্রায়। অ্যাল্পানিজম তাদের জন্য আলাদা কোন স্টাইল ছিল না পর্বতারোহণের। এটা ছিল তাদের পর্বত শিখরে পৌঁছানোর একমাত্র উপায়।

এসব নানাবিধ কারণে দেখা যেত তাদের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি। তাই পোলিশ পর্বতারোহীদের সফলতার হার যেমন ঈর্ষণীয়, মৃত্যুর পরিসংখ্যানও আঁতকে ওঠার মত। এই সোনালী প্রজন্মের পর্বতারোহীদের আত্মনিবেদন বিশ্বের তাবত পর্বতপ্রেমীদের জন্য অনুসরণীয়। এমনই প্রতিকূল কিন্তু অপার সম্ভাবনাময় পরিবেশে যাত্রা শুরু হয় জার্জি কুকোজকার পর্বতারোহণ জীবনের।

 

তিন.

জার্জি কুকোজকার প্রথম হিমালয় পরীক্ষা শুরু নাংগা পর্বত (৮১২৬ মিটার) দিয়ে। তার কাছে প্রথম আট হাজার মিটার শিখরের ডাক নিয়ে আসে কারাকোরাম রেঞ্জের এই পর্বত। প্রথমবারের মতো তিনি ৮০০০ মিটার লাইন অতিক্রম করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে চূড়ার খুব কাছ থেকেই ফিরে আসতে হয়।

এর আগে সোভিয়েত-আফগান সীমান্তে অবস্থিত হিন্দুকুশ পর্বতমালার কয়েকটি চূড়ায় আরোহণ করেন সফলতার সাথেই। আল্পস পর্বতে আহত হয়ে দিতে হয়েছিল কঠিন পরীক্ষা। আলাস্কায় মাউন্ট ম্যাককিনলির মাত্র ৪৫০০ মিটারেই  উচ্চতাজনিত অসুস্থতার স্বীকার হন। শিখরে আরোহন করতে পারলেও নেমে আসেন ফ্রস্ট বাইটে আক্রান্ত হয়ে। তাই পর্বতারোহণ জীবন শুরুর ধাপেই যখন নিজেকে নিয়ে সন্দিহান ছিলেন জার্জি কুকোজকা, ঠিক তখনই তাঁর কাছে লোৎসে অভিযানের প্রস্তাব আসে। সেটা যতটা না ছিল আনন্দের তার চেয়েও বেশি ছিল বিস্ময়ের। এই অভিযান যেন ছিল অতীতের ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে তার নিজেকে নিজের কাছে প্রমাণের এক সুবর্ণ সুযোগ।

এই অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়ার ঘটনাপ্রবাহও খুব চমক জাগানিয়া। পুরো অভিযানের জন্য যে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন ছিল তা সংগ্রহ ছিল দুঃসাধ্য এক কাজ। তার আত্নজীবনীমূলক বই ‘মাই ভার্টিক্যাল ওয়ার্ল্ডে’ এই অর্থ সংগ্রহের ঘটনার কিছু বর্ণনা মেলে।

কুকোজকা নিজে ছিলেন একজন ইল্যাক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। চাকরির সময়টুকুর পর তাঁর পর্বতারোহী দলকে নিয়ে তিনি ঘুরেছেন নানা ফ্যাক্টরিতে। দিনের পর দিন ক্লাইম্বিং রোপে ঝুলে কারখানার আকাশচুম্বী চিমনি পেইন্ট করেছেন অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজনে। কারখামার চিমনিগুলো যেন তাদের কল্পনায় হয়ে উঠতো অন্নপূর্ণা, ধবলগিড়ি, কেটু থেকে মাউন্ট এভারেস্ট। এই কাজ নিয়ে সামান্যতম গ্লানিতে ভোগেননি তিনি। বরং কিছুটা আত্নশ্লাঘাই অনুভব করেছেন। কেননা এই কষ্ট বরণ করার কারনেই তার স্বপ্ন সফলের পথ সুগম হয়ে ওঠে।

লোৎসে অভিযানের সমস্ত প্রস্তুতি শেষ করে তিনি প্রথম পদার্পন করেন ভারতের মুম্বাইয়ে। মুম্বাই থেকে অভিযানের পুরো লটবহর নিয়ে তিনি লরিতে করে যাত্রা শুরু করেন কাঠমন্ডুর উদ্দেশে। আর এই যাত্রায় ঘোর বর্ষায় ভিন্ন রূপে তার সাথে পরিচয় ঘটে ভারতবর্ষ ও তার মানুষের।

পর্বতারোহণ নিয়ে শুরু থেকেই তার মানসিকতা ছিল অন্যদের চেয়ে ভিন্নতর ও অনন্য। বেসক্যাম্পে তিনি লোৎসে পর্বতের চূড়ায় আরোহণের জন্য ক্ল্যাসিকাল রুট থেকে একটু ডানে ঝুঁকে সাউথ ফেস ব্যবহারের প্রস্তাব করেন। কিন্তু অভিযাত্রী দলের কেউই সেই আহ্বানের গুরুত্ব বোঝেনি এবং সাড়া দেননি। তারপর তিনি প্রস্তাব করেন কৃত্রিম অক্সিজেন বিহীন আরোহণের। সে সময়ে অক্সিজেন বিহীন আরোহণের কথা কেউ চিন্তাও করতে পারতেন না। কারণ অতি উচ্চতায় অক্সিজেন ব্যাতীত মস্তিষ্কে কি প্রভাব হয়, তা তখনো মানুষের সুস্পষ্টভাবে জানা ছিল না।

অবশেষে তিনি ও তাঁর আরেক অভিযাত্রী সঙ্গী আন্দ্রেই কৃত্রিম অক্সিজেন বিহীন লোৎসে পর্বতের শিখরে আরোহণ করতে সক্ষম হন। আর এখানেই শুরু হয় তাঁর পর্বতারোহণ জীবনের নতুন অধ্যায়ের। এরপর একমাত্রে এভারেস্ট ব্যতীত আর কোন পর্বতের চূড়ায় আরোহণে তিনি কৃত্রিম অক্সিজেন ব্যবহার করেননি।

কিন্তু কুকোজকার মনের গভীরে গেথে রইলো লোৎসের সেই সাউথ ফেস। সেই অজেয় ও ভয়ঙ্কর রুটের হাতছানিতেই তিনি আবার ফিরে এসেছিলেন ১৯৮৯ সালে। সেই বেদনার্ত অসমাপ্ত গল্প তো আমাদের সবারই জানা।

 

চার.

কুকোজকার পুরো পর্বতারোহণ জীবনটাই নানা ঘটনায় বর্ণিল। লোৎসে (৮৫১৬ মিটার) অভিযানের সময়ই তিনি খুব কাছ থেকে এভারেস্টের (৮৮৪৮ মিটার) গাম্ভীর্যমাখা সৌন্দর্যের দেখা পান। লোৎসে আর এভারেস্টের বেস ক্যাম্প এক হওয়ায় ভিনদেশী অভিযাত্রীদের এভারেস্ট অভিযানকে খুব নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ ঘটে। ৭২০০ মিটার পর্যন্ত রুট এক হওয়াতে পুরো পথ জুড়েই তাকে যেন মোহাবিষ্টের মতো ডেকেছে এভারেস্ট। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি আবার ফিরে আসবেন এই পর্বতরাজের শিখরে নিজেকে নিবেদন করার জন্য। অপেক্ষা শুধু যথাযথ সু্যোগের।

আর কি অবাক করা ব্যাপার, তিনি তার লোৎসে অভিযান শেষ করে পোল্যান্ডে পদার্পণ করা মাত্রই সুযোগ এসে হাজির। কিংবদন্তী পোলিশ পর্বতারোহী আন্দ্রে জাওয়াদা তাকে প্রস্তাব দেন এভারেস্টে প্রথম শীতকালীন অভিযানে অংশগ্রহণের। এমন সুবর্ণ সু্যোগ, এভারেস্টের প্রথম শীতকালীন আরোহনকারী অভিযাত্রী দলের একজন হবার হাতছানি। তবু তিনি সবিনয়ে এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তাঁর প্রথম সন্তান যে পৃথিবীর মুখ দেখার অপেক্ষায়। পর্বত অনেক বড়, তবে তা জীবনের চেয়ে নয়। এমন পরিস্থিতিতে এমন দ্বিধাহীন সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা তার মহিমাকে বাড়িয়ে তোলে।

ঘুমে-জাগরণে এভারেস্ট যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল দিবারত্রি। এই অমোঘ আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি ফিরে আসেন সেই চেনা পথে পরের বছরেই। শিখর স্পর্শ করেন সাউথ পিলার ব্যবহার করে, সম্পূর্ণ নতুন রুটে।

এরপর তিনি যতগুলো পর্বতই আরোহন করেছেন, সবগুলোই অভিনব উপায়ে। পর্বতারোহনে তিনি সবসময় প্রাধান্য দিয়েছেন আপাত দুর্গম্য ও অসম্ভব রুট অনুসরণ করে শিখরে পৌঁছানোর। নতুন রুটে পর্বত শিখরে পৌঁছানো ছিল তার কাছে অদম্য এক নেশা। যে রুটে আরোহনে পর্বতারোহন জগতে আলাদা কোন গুরুত্ব বহন করতো না, সে রুটে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না কখনোই।

১৯৮১ সালে তিনি তার তৃতীয় আট হাজার মিটার পর্বত মাকালু (৮৪৪৫ মিটার) আরোহন করেন। এবার তিনি সম্পূর্ণ একা। অভিযান করেন অ্যাল্পাইন স্টাইলে এবং নতুন রুটে।

ব্রডপিক (৮০৫১ মিটার) আরোহন করেন বিখ্যাত পোলিশ অ্যাল্পানিস্ট ভয়েটেক কুর্তোকারকে সঙ্গী করে ১৯৮২ সালে। তারা দুজনেই আবার গ্যাসারব্রুম ১ (৮০৮০ মিটার) ও গ্যাসারব্রুম ২ (৮০৩৫ মিটার) একত্রে আরোহন করেন সম্পূর্ণ অ্যাল্পাইন স্টাইলে পরের বছরেই।

ধবলগিরি (৮১৬৭ মিটার) ও চোয়্যু (৮২০১ মিটার) আরোহন করেন মাত্র ২৫ দিনের ব্যবধানে। তাও আবার শীতকালে এবং নতুন রুটে। ধবলগিরি আরোহন করে তারপর ভগ্ন ও জর্জরিত শরীর নিয়ে চোয়্যু পর্বতের বেসক্যাম্পে পৌঁছানোর গল্প সত্যিই অনবদ্য। একই শীত মৌসুমে দুটি আট হাজার মিটার পর্বতের চূড়ায় পৌঁছানো প্রথম পর্বতারোহী হন কুকোজকা।

এরপর একে একে তিনি অবশিষ্ট আট হাজার মিটার পর্বতগুলো আরোহন করেন নতুন সব রুটে। এই কোটা পূর্ণ হয় ১৯৮৭ সালের মাঝেই তিব্বতে অবস্থিত শিশাপাংমা (৮০২৭ মিটার) পর্বতে আরোহনের মাধ্যমে।

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এই অভিযানের পারমিট জোগার করতে পেরেছিলেন তিনি। এই অভিযানে পোল্যান্ডের একটি বড় দল তিনটি ভিন্ন রুটে সামিটে পৌঁছান। পৃথিবীখ্যাত পোলিশ পর্বতারোহী ওয়ান্দা রুতকেভিচ একটি সম্পূর্ণ নারী দল নিয়ে এর চূড়ায় আরোহন করেন ক্লাসিকাল রুটে। আর কুকোজকা স্বভাবতই নতুন রুটে কিন্তু সবচেয়ে দুরুহ উত্তর-পশ্চিম রিজলাইন ধরে আরোহন করেন তার ১৪ তম আট হাজার মিটার পর্বত শিখরে।

 

পাঁচ.

পোলিশ পর্বতারোহীরা অন্যদের চেয়ে যে ভিন্ন আর অনেক বেশি নিবেদিত তার প্রমাণ মেলে কুকোজকার বেশ কিছু অভিযানেই। এক্ষেত্রে কেটু (৮৬১১ মিটার) অভিযানের গল্প আসবে সবার আগে। তিনি তার পোলিশ সঙ্গী তাদিউজ পিতোরোস্কিকে সাথে নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক অভিযানের অংশ হয়ে কে’টু বেসক্যাম্পে পৌঁছান। সেখানে বিদেশী পর্বতারোহীদের নতুন রুটে অভিযান চালনায় মোটেই আগ্রহ না দেখে তিনি একই সাথে হতবাক ও আহত হন। অথচ তার পোলিশ অ্যাল্পানিস্ট পর্বতারোহী সঙ্গীরা সর্বদা নিজেদের নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখে ফেলার চেষ্টা করতেন। জোর দিতেন নতুন রুটে অভিযান পরিচালনা করায়।

কে’টু অভিযান যতই অগ্রসর হতে থাকে, অভিযাত্রী দলে অন্য সদস্যরা একে একে নিজেদের সরিয়ে নিতে থাকে দুর্গম রুট ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে। প্রকৃতির সাথে সীমাহীন সংগ্রাম করে তার সঙ্গী তাদিউজ পিতোরোস্কি ও তিনি অবশেষে কে’টু শিখরে পৌঁছেছিলেন। সম্পূর্ণ নতুন এক রুটে এর সাউথ ফেস আরোহন করে। ‘পোলিশ লাইন’ নামে পরিচিত এই রুটে দ্বিতীয় কোন পর্বতারোহী দল চূড়ায় পৌঁছাননি এখন পর্যন্ত।  এখানেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে পোলিশ পর্বতারোহীদের সাথে অন্য পর্বতারোহীদের পার্থক্য। অন্যরা যেখানে হাল ছেড়ে দেয়, পোলিশ পর্বতারোহীরা সেখানেও সবটুকু ঢেলে নিজেদের সহ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান।

প্রকৃতির দেওয়া তীব্র কষ্ট সহ্য করে টিকে থাকার লড়াইয়ে বরাবরই সফল হয়েছিলেন কুকোজকা। জনপ্রিয় পর্বতারোহী মেসনারের ভাষ্য অনুযায়ী অ্যাল্পাইন স্টাইলের অন্যতম মূলমন্ত্র হল পর্বতের কাছে নিজেকে উন্মোচিত রেখে একে জেনে বুঝে আরোহনের চেষ্টা করা। জার্জি কুকোজকার পর্বতারোহন জীবন বিশুদ্ধ এল্পানিজমের উজ্জ্বল এক দৃষ্টান্ত।

 

ছয়.

‘হিমালয় তাজ’ বলতে যা বোঝায়, দ্বিতীয় মানব হিসেবে তার অধিকারী হয়েছিলেন জার্জি কুকোজকা। ১৪ টি আট হাজার মিটার চূড়ার স্পর্শেই এই অলিখিত অনন্য সম্মাননা মেলে। ১৯৭৯ সালে শুরু করে মাত্র ৭ বছরে তিনি এই কৃতিত্ব অর্জন করেন। পর্বতারোহন জগতে যার সাথে কুকোজকার তুলনা করা হয়, সেই রেইনহোল্ড মেসনারের এই কৃতিত্ব অর্জনে লেগেছিলো ১৬টি বছর। তবে এই দুই মহান পর্বতারোহীর মাঝে কোন রকম তুলনার রেখা না টেনেও কুকোজকার অর্জন ও তাঁর জীবনকে মূল্যায়ন করা যায়। কোন প্রতিযোগিতায় প্রথম বা দ্বিতীয় হওয়া নয়, তার চালিকা শক্তি ছিল পর্বতের প্রতি তার দুর্নিবার আকর্ষণ। পার্থিব জয়মাল্য বরণের লোভ তাঁকে তাঁর মনোযোগ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তার সমস্ত মনোজগত জুড়েই ছিল পর্বত।

কুকোজকার জীবন সফলতার গল্প আসলে এতো একরৈখিক ছিল না। ব্যর্থতা এসেছে বহুবার। মৃত্যুর সাথে তার পরিচয় ঘটেছে পদে পদে। টাটরা পর্বতে নিজের প্রথম পর্বতারোহী সঙ্গী, তার বন্ধুকে হারিয়েছিলেন। পর্বতারোহন ছেড়ে দেবার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন নিজের কাছেই। কিন্তু যার রক্তেই মিশে গেছে পর্বতারোহনের নেশা, তাকে কিভাবে ফেরানো যায়! বন্ধুকে সাথে করে জয় করতে চেয়েছিলেন যে পর্বত, আবার ফিরে যান সেখানে, একা। সেই অজেয় নিষ্ঠুর শিখর পদদলিত করার বাসনায়।

কে’টু আরোহন করেন প্রিয় সঙ্গী তাদিউজ পিতোরোস্কিকে সাথে নিয়ে। চূড়া থেকে ফিরে আসার সময় পিতোরস্কি তার ক্রাম্পন পা থেকে হারিয়ে ফেলেন। এরপর দুর্ঘটনায় চিরতরে হারিয়ে যান কে’টু পর্বতের খাদে।

এভাবে একে একে মৃত্যুকে সাক্ষী রেখেই তার পর্বতারোহন জীবন এগিয়ে চলেছে। পর্বতের প্রতি ভালোবাসায় সেই মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে গেছেন বারবার। অবশেষে সেই অজেয় মৃত্যুর কাছেই নিজেকে সমর্পণ করেন জার্জি কুকোজকা। শেষ আশ্রয় মেলে তার প্রিয় পর্বতের কোলেই। যেখানে হয়েছিল এই স্বপ্নময় জীবনের শুরু।

 

সহায়


১. My Vertical World: Climbing the 8000-Metre Peaks by Jerzy Kukuczka/ Andrew Wielochowski (Translator). Published August 1st 1992 by Mountaineers Books.

২. Freedom Climbers by Bernadette McDonald. Published October 15th 2011 by RMB | Rocky Mountain Books.

৩. Jerzy Kukuczka, ‘K2’s South Face’ (American Alpine Journal 1987)

৪. Shisha Pangma, ‘My Fourteenth 8000er by Jerzy Kukuczka’ (American Alpine Journal 1989)

৫. Ingeborga Doubrawa-Cochlin, ‘A Tribute to Jerzy Kukuczka’  (The Alpine Journal 1990)

৬. Andrzej Zawada, ‘The First Winter Ascent of Cho Oyu’ (The Alpine Journal 1988)

৭. Damian Granowski, ‘Jerzy Kukuczka-Short Biography and List of Ascents’ (http://winterclimb.com/climbing-base/item/3-jerzy-kukuczka)

৮. Adam Bilczewski, ‘Dhaulagiri 1984-85’ (The Himalayan Journal 1987)

৯. Art of Freedom (2011), Documentary Film


 

(Visited 1 times, 1 visits today)
জাহিদুল ইসলাম জুয়েল
জাহিদুল ইসলাম জুয়েল
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছেন জাহিদুল ইসলাম জুয়েল। পাহাড়ের মানুষের সারল্য,তাদের জীবনযুদ্ধ অনেক কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান বলেই বারবার পাহাড়ে ফিরে যান। তার প্রচন্ড আগ্রহের জায়গা হচ্ছে চলচ্চিত্র। মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প ফ্রেমে বন্দী করে ফেরি করে যেতে চান।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)