কাং ইয়াৎসের ডায়েরি

কাং ইয়াৎসের ডায়েরি

অভিযান সময়কাল
জুলাই, ২০১৬

দলের সদস্য
মাহমুদুল হক রানা, বিজন সরকার

গাইড
ছেওয়াং শেরপা


২ জুলাই
রাতে যাত্রা শুরু মালিবাগ থেকে কলকাতার উদ্দেশে।

৩ জুলাই
কলকাতা থেকে এয়ার ইন্ডিয়াতে দিল্লী, তারপর রাত ২ টার বাসে দিল্লী থেকে চণ্ডীগড়।

৪ জুলাই
চণ্ডীগড় থেকে ভোর ৬টার বাসে ১০ ঘণ্টা যাত্রা শেষে মানালি।

৫ জুলাই 
বিশ্রাম দিন।

৬ জুলাই
ভোর ৩ টায় বৃষ্টির মাঝেই লাদাখের দিকে যাত্রা শুরু। তাড়াহুড়ার কারণে, টানা ভ্রমণ করে একদিনেই লাদাখে পৌঁছানো দরকার। তবে, অবশ্যই দুই দিনে করা উচিত, হাই অল্টিচুড সিকনেস থেকে বাঁচার জন্য, কারণ চারটা ৫০০০ মিটার পাস এই হাইওয়েতে অতিক্রম করতে হবে।

৭ জুলাই
ঈদের দিন। লাদাখের (লেহ) উচ্চতার সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্য আজকের দিনটা বিশ্রাম। সহযাত্রী বিজন উচ্চতাজনিত কারণে লেহ পৌঁছানোর পর থেকেই অসুস্থ। ৮ জুলাই রাতে আমরা পরিকল্পনা করি, যদি পরের দিনও বিজনের অবস্থার উন্নতি না হয়, তবে আমি একাই এগোব। হাতে সময় বেশি নেই, দেশে ফিরেই পরদিন অফিস ধরতে হবে।

৮ জুলাই
বিজনের অবস্থার বেশ উন্নতি হল। সকালে আমাদের গাইড ছেওয়াং শেরপার সাথে দেখা আর কেনাকাটা শেষে, বিকালে হোটেলে ফিরেই শুনলাম দুঃসংবাদ। এতদিনের পরিকল্পনা করা ‘স্টোক কাংড়ি’র পারমিট আমরা পাব না, কারণ ৫ দিন আগেই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার ঘটনাটা ঘটেছে; তাই কোন বাংলাদেশিকেই লেহ এয়ারপোর্ট নিকটবর্তী স্টোক কাংড়ির পারমিট দেওয়া হচ্ছে না। আধা ঘণ্টার মধ্যে আমরা ঠিক করলাম, এতো দূর এসে ৬০০০ মিটারের কোন একটা পর্বত চেষ্টা না করে আমরা ফিরবো না। তাই পরিকল্পনার বদল করলাম। ঠিক হল আমরা ‘কাং ইয়াৎসে-২’ যাবো। পরদিন সকাল ৯ টায় শুরু করবো, এই চিন্তা করেই ঘুমাতে গেলাম।

আমাদের প্রথম দিনের ক্যাম্পসাইট। জায়গাটার নাম ছিল, চ্যাসকারমো। যদ্দুর পর্যন্ত জীপ আসে, ঐখান থেকে ৩-৪ ঘণ্টার ট্রেকিং দূরত্ব। পিছন দিকে সবচেয়ে কাছের গ্রামটাও প্রায় এক ঘন্টা দূরত্বের আর, সামনের দিকের সবচেয়ে কাছের লোকালয় প্রায় ৮-১০ ঘন্টা দূরের। এইরকম এক নির্জন জায়গায় শুধু আমরা তিনজন। স্থানীয়রা বলে শীতকালে এইদিকটায় স্নো লেপার্ড আসে।সারারাত নিচের বরফগলা নদীর শব্দ আর স্নো লেপার্ডের কথা চিন্তা করেই ৪০৫০ মিটার উচ্চতার এই অদ্ভুত সুন্দর ক্যাম্পটাতে আমাদের প্রথম রাত পার হলো।


৯ জুলাই
আগের রাতে ঘুম হয়নি, কারণটা খুবই স্বাভাবিক; এমন একটা পর্বতে বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে যেটার ব্যাপারে আগে থেকে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। এমনকি রুটটা কেমন হবে না হবে এসব নিয়ে পড়ালেখা করারও সুযোগ পেলাম না। শেরপার কাছ থেকে শুনলাম, প্রথমদিনে ট্রেক খুবই কম; ৪ ঘণ্টার মতো।

নেপালের তুলনায় একদম ভিন্ন জায়গাটা। প্রথম দেখাতে মাথায় খালি মুস্তাং আর তিব্বতই আসবে। রুক্ষ, কিন্তু অসম্ভব সুন্দর আর নির্জন। ৪ ঘণ্টার ট্রেক শেষে ‘চ্যাসকারমো’ নামে একটা জায়গায় পৌঁছালাম। একটাই মাত্র দোকান; কিন্তু দোকানদারও রাতে থাকবে না। ক্যাম্প সেট করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। দোকান থেকেই চাল আর ডাল নিয়ে খিচুরি রান্না করলাম নিজেরা। ভয়ংকর ক্ষুধায় পেট ভরে খেয়ে নদীর পাড়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে ঘুম দিলাম। ক্যাম্পে শুধু আমরা ৩ জন। আশেপাশে ৫ কিলোমিটারেও কেউ নেই।

২য় দিন, স্থানীয়রা সকালে বলে দিলো রাস্তা একটু লম্বা, ৬-৭ ঘন্টা লাগতে পারে। কিন্তু ৬-৭ ঘন্টা পর পৌঁছানো তো দূরে থাক মাঝ রাস্তাও পার করতে না পেরে প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে, আমরা রাস্তাতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম থেকে উঠে চোখ খুলে দেখি এই অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য। আমাদের মাথার উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে শত শত হরিণসদৃশ প্রাণী। প্রথমে ভেবেছিলাম, প্রচন্ড তৃষ্ণা আর ক্ষুধায় হয়তো আমার দৃষ্টিভ্রম হচ্ছে। 


১০ জুলাই
আজ অনেকটা রাস্তা যেতে হবে, এটাই শুধু জানি। ঐ দোকানদার বলল ৬/৭ ঘণ্টা লাগবে, তাই আরামেই শুরু করলাম। কিন্তু ৬ ঘণ্টা পর খেয়াল করলাম, আসলে সবচেয়ে বড় বাধাটাই এখনো অতিক্রম করিনি, বিশাল এক পাস চোখের সামনে তখন, অথচ আমার আর বিজনের কাছে আছে সব মিলিয়ে আধা লিটার পানি, শেরপার কাছে আরো আধা লিটার।

সেদিন বুঝতে পারলাম, কেন মানুষজন এই পথ দিয়ে কাং ইয়াৎসের দিকে আগায় না। আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিন কাটালাম হয়তো। পানি আর খাবার ছাড়া ৩ জনের জীবনের অন্যতম বড় শিক্ষা নিলো ঐ দিন এই পাস। ৬/৭ ঘণ্টার রাস্তা আমরা ঠিক ১১ ঘণ্টায় শেষ করলাম। অবশেষে নিমালিং পৌঁছালাম। এটাই সেই ভয়ংকর ‘গং মারুলা পাস’।

১১ জুলাই
শরীরে আর কিছু বাকি নেই। শরীরটা খুবই দুর্বল, প্রচণ্ড মাথা ব্যথা। মন বলছে ফেরত যাই। আমাদের মতো এমন এতটা অপ্রস্তুত অবস্থায় কাউকে তখন দেখছি না। সবার সাথে অনেক পোর্টার, গাধা, ক্যাম্প, কুক; আর আমরা শুধু ৩ জন। এর মাঝেই বিকেলে বের হলাম একাই; এই উচ্চতার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য। নয়তো পরদিন সামিট প্রচেষ্টা নেওয়া অসম্ভব। আমরা এখন প্রায় ৪৮০০ মিটারে আছি। মাথা ব্যথা লেগেই আছে পুরো অভিযানে।

নিজেকে আরোহণের জন্য প্রস্তুত করতে শেষ বিকালে একাই হাঁটতে আসলাম একটু উপরে। উপর থেকে তখন তোলা নিমালিংয়ের এই ছবি, ভিন্ন কোন গ্রহ মনে হচ্ছিলো।


১২ জুলাই
সকাল থেকেই আমরা দুই জন খুবই উত্তেজনার মধ্যে আছি। আজ বিকাল থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু। বাধ্য হয়ে অসম্ভব একটা পরিকল্পনা করতে হচ্ছে। পরিকল্পনাটা এমন–এই ৪৮০০ মিটার নিমালিং থেকে বিকালে রওনা দিয়ে ৫০০০ মিটার উচ্চতার বেইজ ক্যাম্পে আজ পৌঁছাব। তারপর রাতে বেইজ ক্যাম্প থেকে কোন খাবার জোগাড় করতে পারলে সেটা খেয়ে রাত ১ টায় আরো ১২০০ মিটার আরোহণ করার চেষ্টা করবো!

সহযাত্রী বিজন চলে যাওয়ার পর থেকেই কেমন জানি একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল। এইরকম অদ্ভুত একটা নির্জন জায়গায়, এইরকম একটা হিমশীতল রাতে, বলতে গেলে সাথে কোন খাবার নাই, পানি গরম করার জন্য স্টোভ নাই, এমন কি গরম পানি রাখার কোন পটও নাই। এইরকম পরিস্থিতিতে রাত ১ টার সময় ঐ পাহাড়টার জন্য শুরু করতে হবে, এসবই খালি মাথায় ঘুরছিলো। শেরপা বন্ধু বলল একটু ঘুমিয়ে নিতে। কিন্তু, একটু পরের কথা চিন্তা করে, উত্তেজনায় মাত্র আধা ঘন্টার জন্যই ঘুমাতে পেরেছিলাম। তারপর তাঁবু থেকে বাইরে বের হয়ে এসে এই দৃশ্য দেখে হুট করেই আমার মনে হল আমি একদম শান্ত হয়ে গিয়েছি, অস্থিরতা সব উধাও হয়ে গেছে; অসাধারণ সুন্দর কাং ইয়াৎসেকে চাঁদের আলোতে দেখে। 


বিকাল ৫ টায় রওনা দিয়ে ২ ঘণ্টার মাঝেই বেইজ ক্যাম্প পৌঁছে গেলাম। আজ কেমন জানি ভেতর থেকে একটা শক্তি অনুভব করতে পারছি। যদিও গত চারদিনে একটুও মাংস স্পর্শ করতে পারিনি, প্রোটিন বলতে ঐ স্বাদহীন ডাল। বেইজ ক্যাম্পে পৌঁছানোর আধা ঘণ্টা পর বিজন সিদ্ধান্ত নিলো শরীরের এই অবস্থায় ওর পক্ষে আর আগানো সম্ভব না। তাই ঐ মুহূর্তেই নিচে নামা শুরু করলো। জীবনে প্রথমবারের মতো নিজেকে এতটা একা লাগছিল। এতো দিন যার সাথে পরিকল্পনাগুলো করেছি, সেও যাচ্ছে না। পতাকাটা বুক পকেটে নিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম একটু। পুরাটা সময় আবোল-তাবোল স্বপ্ন দেখে রাত ১১ টায় ঘুম ভাঙ্গলো। একটা ইউরোপিয়ান দল থেকে শেরপা একটু ডাল আর ভাত যোগাড় করলো। আমাদের সাথে কোন চুলা নেই যে কিছু একটা রান্না করবো। অসম্ভব সুন্দর এই চাঁদের নিচে রাত ১ টায় অসম্ভবের দিকে যাত্রা শুরু করলাম।

৫ ঘন্টা টানা ক্লাইম্ব করার পর ভোর ৬ টায় হাই ক্যাম্পে পৌঁছালাম। দুইজন একটা চকলেট খেয়ে ক্রাম্পন পরে জীবনে প্রথমবারের মতো হিমবাহে নামলাম। কাং ইয়াৎসের হিমবাহের প্রথম ভাগটা নিঃসন্দেহে বেশ কঠিন, অন্তত এই ক্লান্ত ঘুমহীন অবস্থায়। হিমবাহটা শেষ করার পর শুরু হল অসম্ভব ক্লান্তিকর স্নো। হাঁটু পর্যন্ত স্নো কতটা শক্তি শুষে নিতে পারে তা ঐদিনই অনুভব করতে পেরেছিলাম। সকাল ৮ টার দিকেই আমাদের দুই জনের শক্তি প্রায় শেষের দিকে। আরো ৩৫০ মিটার সামনে। বাকিটা রাস্তা শুধু মাত্র বুক পকেটে রাখা পতাকার শক্তি দিয়েই নিজেকে এগিয়ে নিচ্ছিলাম।

সকাল ১০ টা। সামিট থেকে ঠিক ১৫০ মিটার নিচে; বাতাস বাড়ছে। জীবনের সবচেয়ে ক্লান্ত মুহূর্তে আমরা; এই অমানুষিক প্রচেষ্টার পর, আর এগুলে হয়তো নিচে নামাটা আমাদের নাও হতে পারে। তাই ছেওয়াংয়ের জোরাজুরি আর আমার চোখের সামনে ভেসে উঠা মানুষগুলার কথা চিন্তা করেই ১৫০ মিটার বাকি রেখে ফেরার পথ ধরলাম। কখনো চিন্তা করিনি, এই নিরীহ ফেরার রাস্তাটাও এতোটা কষ্টের হবে। কয়েকবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অবশেষে দুপুর ২ টায় প্রথমবারের মত একটা সমতল জায়গা পেয়েই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে শুয়ে পড়লাম। ১ ঘণ্টা বেহুশের মতো ঘুমালাম। শরীরে আর কিছুই নেই, না পানি, না কোন খাওয়া।

সকাল ১০ টা – প্রথমবারের মতো ৬০০০ মিটারের উচ্চতা ক্রস করার পর তোলা। আর ৫০ মিটারের মতো উপরে গিয়েই জীবনের সবচেয়ে ক্লান্ত আর একই সাথে তৃপ্ত অনুভূতি নিয়ে অভিযান শেষ করতে হয়। বেঁচে থাকলে হয়তো আবার ফেরা হবে।


বিকাল ৪ টায় ক্যাম্পে পৌঁছালাম। তখনো কোন খাওয়া নেই। ঐ টিমটার কাছ থেকে চেয়ে একটা নুডলস খেয়েই আবার মাটিতে শুয়ে পড়লাম। বিকাল ৬ টায় নিমালিং পৌঁছে বন্ধু বিজনকে দেখে আবার সেই শক্তি ফিরে পেলাম। বাসায় পৌঁছানোর শক্তি, দেশে ফিরে যাওয়ার শক্তি।

কোন স্টোভ, গরম পানির পট, অতিরিক্ত শুকনো খাবার, ফার্স্ট এইড বক্স ছাড়া আমরা ৩ জন যে চেষ্টাটা করেছি, এইটাই আমাদের জন্য অনেক পাওয়া। অনেক খুশি হবো, যখন আমাদের দেখানো পথে কোন বাংলাদেশিকে দেখবো কাং ইয়াৎসের চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা উড়াতে।

(সমাপ্ত)

(Visited 1 times, 1 visits today)
মাহমুদুল হক রানা
মাহমুদুল হক রানা
সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত মাহমুদ রানার শখ ফুটবল আর পাহাড়।পর্বতারোহণে বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্য স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিবেদিত থাকতে চান। আমাদের পাহাড়, নদী ও বনভূমিকে সকলে ভালবাসবে এমনটাই স্বপ্ন দেখেন তিনি।

২ thoughts on “কাং ইয়াৎসের ডায়েরি

  1. দারুণ লিখা হইছে রানা! এতোটা আত্মত্যাগের ফলে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করলি, সেটা বিশাল ব্যাপার। আরো দারুণ সব অভিযানে যাবি, ইনশাল্লাহ 🙂

  2. রাব্বির কাছে শুনসিলাম তোমাদের যাওয়ার কথা। বাট ইন্টেন্সিটি বুঝি নাই। এক কথায় অসাধারণ।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)