‘সামিটে পৌঁছাতে না পারা ব্যর্থতা নয়, পর্বতে মৃত্যুই হল ব্যর্থতা’


৩০ এপ্রিল-রবিবার, গতকাল সকালে চিরদিনের মত বন্ধ হয়ে গেল পর্বতারোহণের সুইস মেশিন। ৪১ বছর বয়সী সুইস আল্পাইনিস্ট উইলি স্টেক উচ্চতম পর্বত মাউন্ট এভারেস্টের ক্যাম্প-১ এর কাছে এক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন।

৬ জনের একটি উদ্ধারকারি দল এভারেস্ট মাসিফের পশ্চিমে অবস্থিত নুপৎসে পর্বতের পশ্চিম ঢালের নিচ থেকে উইলিকে চিরনিদ্রায় শায়িত অবস্থায় পান। সম্ভবত তার পা হড়কে গিয়েছিল, আর আছড়ে পড়েছিলেন বরফাচ্ছাদিত ঢালে। তার ছিন্নবিচ্ছিন্ন শরীরের অংশগুলো সংগ্রহ করে দলটি। তারপর পরম যত্নে তা বিমানে বয়ে নেওয়া হয় লুকলা বিমানবন্দরে।

১২ বছর বয়সে রক ক্লাইম্বিংয়ের মাধ্যমে হাতেখড়ি পাওয়ার পর থেকে উইলির জীবনে একদিনের জন্যেও পাহাড়ের টানে ভাটা পড়েনি। ২০০৯ ও ২০১৪ সালে দুইবার মাউন্টেনিয়ারিংয়ের অস্কার খ্যাত পিওলে ডি ওর জিতে নেওয়া এই পর্বতারোহীর ঝুলিতে অনেক অনেক পর্বত আরোহণের রেকর্ড থাকলেও তার বিশেষ দূর্বলতা ছিল নিষ্ঠুর প্রতিবেশী আইগারের দিকে। নিজের বাড়ি থেকে ৩০ মিনিট গাড়ি দূরত্বের এই পর্বতে সর্বমোট ৩৫ বার আরোহণ করেন তিনি, বেশিরভাগ সময়েই দূর্গম নর্থ ফেস দিয়ে। আরেক সুইস ক্লাইম্বার নিকোল’কে বিয়ে করার পর মধুচন্দ্রিমার কাজটিও সারেন আইগারেই। এই রুটে সবচেয়ে কম সময়ে সামিটের রেকর্ডও তার দখলে।

২ ঘন্টা ৪৭ মিনিটের রেকর্ডটিও তার নিজের রেকর্ড ভেঙ্গেই করেছিলেন তিনি। আইগার নিয়ে করা এইসব অকল্পনীয় চিন্তার অসাধারণ বাস্তবায়নই উইলিকে জনপ্রিয় করে তোলে পর্বতারোহীদের জগতে।

২০০৫ সালে উইলি মনোযোগ দেন হিমালয়ের দিকে। কিন্তু ইতিহাস বলে এই ভালোবাসাটা বড্ড একতরফা ছিল, হিমালয় বারবার তাকে আশাহত করেছে। প্রথমবার খালি হাতেই তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো অন্নপূর্না। অন্নপূর্ণা সাউথ ফেসে অনেক প্রস্ততি নিয়ে সলো ক্লাইম্বিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তিনি, কিন্তু আরোহণের এক পর্যায়ে উপর থেকে ছুটে আসা পাথর মাথায় এসে লাগে। ভাগ্য নিতান্ত ভালো ছিল বলেই সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলেন, কিন্তু সামিট করা হয়নি।

পরের বছর আবার ফিরে আসেন নতুন উদ্যমে, এক্লিমাটাইজেশনের সময় তেনকামবোচে (৬৫০০ মিটার) নামে বেশ জটিল ও সম্পূর্ণ আনকোরা পর্বত আরোহণ করেন। কিন্তু বিপদাপন্ন পর্বতারোহীদের উদ্ধার করতে গিয়ে একজনের করুণ মৃত্যু দেখে বিষাদে ভেঙ্গে পড়েন। সেবারও স্বপ্নের অন্নপূর্ণা প্রজেক্ট অধরা থেকে যায়।

আর অনেক পর্বতে দ্রুততম সফলতা থাকলেও প্রথমবারের মত এভারেস্ট অভিযানে যেয়ে ব্যর্থ হন তিনি। ৮৭০০ মিটার উপর থেকে ফ্রস্টবাইটে আক্রান্ত পা নিয়ে ফিরে আসতে হয় তাকে। হিমালয়ের এই বার বার মুখ ফিরিয়ে নেওয়াই হয়ত দ্বিগুন আকর্ষণে টেনেছে তাকে।

২০১২ তে এভারেস্ট আরোহণ করেন উইলি স্টেক। দিন দিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিলেন প্রতিভাবান এই পর্বতারোহী। ২০১৩ সালে মাত্র ২৮ ঘন্টায় বহুল প্রতীক্ষিত দুর্গম অন্নপূর্ণা সাউথ ফেস সামিট করেন, অথচ আল্পাইন স্টাইলে এই সামিটে সাধারণত সময় লাগে চার থেকে পাঁচ দিন!

প্রশ্ন থেকে যায়, এভারেস্ট সামিট সেই ২০১২ তে হয়ে যাওয়ার পর আবার কেন ফিরে গিয়েছিলেন তিনি ওই মৃত্যু উপত্যকায়? প্রি মনসুন মৌসুমে এভারেস্টের পশ্চিম রিজের দূরহ ‘হর্নবিন কুলিয়র’ দিয়ে কৃত্তিম অক্সিজেন ছাড়াই সামিটের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ছিলো স্টেকের। তবে এখানেই শেষ নয়, পর্বতারোহণের ইতিহাসে একটি অসাধারণ স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য এভারেস্ট সামিট থেকে সাউথ কল ধরে লোৎসে সামিট করে পরিচিত পথ ধরে নেমে এসে এভারেস্ট-লোৎসে ট্র্যাভার্স শেষ করার পরিকল্পনাও ছিল তাদের। সে জন্যেই শেরপা তেনজিকে সঙ্গে নিয়ে এভারেস্ট এর খুম্বু অঞ্চলে প্রায় মাস খানেক সময় ধরে তিনি নিজের শরীরকে মানিয়ে নিচ্ছিলেন।

এইতো, মাত্র চারদিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে উইলি তার এক্লিমাটাইজেশন পরিকল্পনার ব্যাপারে লিখেছিলেন- ‘একদিনে দ্রুত বেস ক্যাম্প থেকে ৭০০০ মিটার উচ্চতায় উঠলাম আবার নেমে আসলাম। এত অসাধারণ এই জায়গা। ভালোবাসি এই জায়গাটাকে। আমি এখনো দ্রুত আর সক্রিয় এক্লিমাটাইজেশন পদ্ধতিতে বিশ্বাসী। উচ্চতায় রাত্রিযাপনের থেকে এইটা বেশি ভাল!’

এই ফেসবুক থেকেই জানা যায়, বেস ক্যাম্প-২ এ তিনি দুই রাত কাটিয়েছিলেন। ২৪ এপ্রিলের আরেকটি স্ট্যাটাসে বলেছিলেন তেনজিং শেরপা কিছুদিন আগে ফ্রস্ট বাইটে আক্রান্ত হয়েছিলো। সে দ্রুত সেরে উঠলে আবার পর্বতে মিলিত হওয়ার আশাও প্রকাশ করেন তিনি ওই স্ট্যাটাসে। তার সঙ্গী তেনজি সাথে না থাকায় উইলি একাই এক্লিমাটাইজেশন করছিলেন। তাই ঠিক কি কারণে তিনি চলে গেলেন তা হয়ত এই মুহুর্তেই জানা যাচ্ছে না।

খুব কাছ থেকে মৃত্যু দেখেছেন স্টেক অনেকবার। গত বছরের শুরুর দিকেই শিশাপাংমা অভিযানে তিনি ও তার জার্মান ক্লাইম্বিং সঙ্গী ডেভিডগটলার আবিষ্কার করেন ১৭ বছর আগে হিমবাহ ধ্বসে হারিয়ে যাওয়া কিংবদন্তী আল্পাইনিস্ট এলেক্সলোয়ে এবং তাঁর সঙ্গী ডেভিড ব্রিজেসের মৃতদেহ। ২০১৫ সালে নিজের ‘৮২ সামিট চ্যালেঞ্জ’ প্রজেক্টের এর সময় তিনি হারান নিজের ক্লাইম্বিং সঙ্গী মার্টিন সেউরেনকে। কিন্তু কখন মৃত্যু পায়ে পায়ে তার এত কাছে এসে দাড়িয়েছে সেটিই হয়ত বোঝেননি।

স্পিড ক্লাইম্বিংকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া উইলি একবার এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘আপনারা হয়তো জানেন সম্প্রতি আমি বিয়ে করেছি। আমার স্ত্রী একজন সুইস এবং আপনাদের সবাইকে সাবধান করে দিতে চাই সুইস মেয়েরা কিন্তু খুবই কড়া। তো বিয়ের পর যা হয়! ঘর থেকে অনেকদিনের জন্য বাইরে যাওয়াটা মানে অনুমতি মেলাটা ক্রমে কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাচ্ছিল। তাই ভাবলাম এমন কিছু একটা করতে হবে যাতে বউয়েরও মন রক্ষা হয় আবার আমার প্যাশনের ব্যাপারটাও ঠিক থাকে। সেই থেকে আমি স্পিড ক্লাইম্বার!’

হিমালয়ের সঙ্গে নিয়ত খুনসুটি করে যাওয়া এই পর্বতারোহীকে কখনো হিমালয় হারিয়ে দিয়েছে, আশাহত করেছে আবার কখনো ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিয়ে জিতিয়ে দিয়েছে আশাতীত সাফল্য দিয়ে। কিন্তু এই শেষ যাত্রাকে আমরা কি বলব? উইলি বলতেন- ‘সামিটে পৌঁছাতে না পারা ব্যর্থতা নয়। ব্যর্থতা হচ্ছে হাত ও পায়ের আঙ্গুলগুলো হারিয়ে ফেলা, পর্বতে মৃত্যুই হল ব্যর্থতা।’ এই মৃত্যুকে কি আমরা ব্যর্থতা বলব? নাকি দারুণ জেদী এই মানুষটাকে হিমালয়ের নিজের গভীরে ধরে রাখার প্রচেষ্টা?

উইলি স্টেক হয়ত চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন, কিন্তু তার পাগলামীগুলো, আপাত অকল্পনীয় ও অসম্ভব ভাবা পরিকল্পনাগুলো এবং সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য তার জেদ আর কঠোর পরিশ্রম আমাদের নিজেদের চিন্তা ও কল্পনার সীমাকে ছাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাবার প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে সবসময়।

[সকল ছবি] www.uelisteck.ch


 

(Visited 1 times, 1 visits today)
মাহবুবা ইসলাম বহ্নি
মাহবুবা ইসলাম বহ্নি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতক। নিজেকে রূপকথার কিম্ভুত ফিনিক্স হিসেবে পরিচয় দেন। লেখালেখি তার ভাললাগা আর ঘুরাঘুরি তার ভালবাসা।

One thought on “‘সামিটে পৌঁছাতে না পারা ব্যর্থতা নয়, পর্বতে মৃত্যুই হল ব্যর্থতা’

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)