‘আমা দাবলাম’ যাচ্ছেন এম.এ. মুহিত

[ছবি] নিজাম উদ্দিন


হিমালয় পর্বতমালার সলো খুম্বু অঞ্চলের এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প ট্রেকিং ও ৬৮১২ মিটার উচ্চতার  “আমা দাবলাম” পর্বত শিখর অভিযানে যাচ্ছে পর্বতারোহণ ক্লাব “বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব (বিএমটিসি)”। এ উপলক্ষে গতকাল ১২ অক্টোবর ২০১৮ শুক্রবার বেলা ১১ টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে পতাকা প্রদান এবং সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং বিশিষ্ট স্থপতি ও মুক্তিযোদ্ধা মোবাশ্বের হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেডের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব হাসান ইকবাল। উক্ত অনুষ্ঠানে ট্রেকিং ও পর্বতাভিজানে অংশগ্রহণকারী অভিযাত্রীদের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দেন উপস্থিত অতিথিরা। পরে এম.এ. মুহিত তাদের অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

বিএমটিসি’র ছয় সদস্যের দলটি আগামী ১৫ অক্টোবর নেপালের উদ্দেশে রওনা হবেন। এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্পের পথে ইফফাত ফারহানা তান্নি, কাওসার রুপক, মারুফ সালাম, আরিফুল ইসলাম ও সুজয় সেনগুপ্তের সাথে দলনেতা হিসেবে থাকবেন পর্বতারোহী এম.এ. মুহিত। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, নেপালের লুকলা থেকে তারা ট্রেক শুরু করে ৫৩৬৪ মিটার উচ্চতার এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্পে যাবেন। এ সময় তারা ৫৫৪৫ মিটার উচ্চতার কালা পাত্থার চূড়া আরোহণের চেষ্টা করবেন। ট্রেক শেষে বাকিরা দেশের পথে ফিরে আসবেন ও এম.এ. মুহিত তার শেরপা গাইডকে সাথে নিয়ে আমা দাবলাম চূড়া আরোহণের জন্য রওনা হবেন। প্রায় ৩০ দিন ব্যাপী এই অভিযানে নভেম্বর ৭ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে এম.এ. মুহিতের সামিটে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

আমা দাবলামের মত একাধারে দূরহ ও নান্দনিক পর্বত চূড়া পৃথিবীতে খুব কমই আছে। দূর্ভেদ্য পিরামিডের মত এর আকার ও আকৃতি যুগ যুগ ধরে পর্বতারোহীদের মোহবিষ্ট করে রেখেছে। নেপালি ভাষায় আমা দাবলাম শব্দের অর্থ হচ্ছে মায়ের গলার হার। চূড়াটির উত্তর ও দক্ষিণ থেকে নেমে আসা দুটি গিরিশিরা দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোন মা (আমা) দু হাত ছড়িয়ে তার সন্তানকে আঁকড়ে ধরে আছে। আর পর্বতটির গায়ে ঝুলে থাকা ভঙ্গুর হিমবাহ দেখে মনে হয় যেন তা হারের মত মায়ের গলায় ঝুলে আছে।

এক সময় মনে করা হত এই পর্বত চূড়ায় আরোহণ একেবারেই সম্ভব নয়। তবে ১৯৬১ সালে একটি বৈজ্ঞানিক অভিযান চলাকালীন সময়ে আমেরিকা, ব্রিটেন ও নিউজিল্যান্ডের চার আরোহী প্রথমবারের মত হিমালয়ের অন্যতম দূরহ পর্বতটি আরোহণ করতে সক্ষম হন। এই চূড়ায় আরোহণের জন্য টেকনিক্যাল ক্লাইম্বিংয়ের প্রয়োজন পড়ে, অর্থাৎ এর আরোহণে ফিক্সড রোপ, আইস স্ক্রু, ক্রাম্পন, ক্যামিং ডিভাইস, জুমার, আইস এক্স সহ অন্যান্য টেকনিক্যাল সাজসরঞ্জাম ব্যবহৃত হয়। এই পর্বতে খাড়া দেয়ালের মত জায়গায় একই সাথে পাথর, তুষার ও বরফের মত ফিচার একই সাথে অতিক্রম করতে হয়, যা এই উচ্চতায় বেশ দূরহ ও কঠিন কাজ।


[ছবি] জাস্টিন মার্লে


দক্ষিণ দিক থেকে নেমে আসা গিরিশিরা আমা দাবলাম আরোহণের সবচেয়ে প্রচলিত পথ। এম.এ. মুহিত এই দক্ষিণ-পশ্চিম রিজলাইন ধরেই আরোহণের চেষ্টা করবেন।  ৪৫০০ মিটার উচ্চতার সবুজে ছাওয়া তৃণভুমিতে আমা দাবলাম এর বেইজ ক্যাম্প। সেখান থেকে পাথুরে পথ ধরে ঘন্টা ছয়েকের মত ট্রেক করে ৫৬০০ মিটার উচ্চতায় স্থাপন করা হয় ক্যাম্প-১। এ পথে যাবার সময় পশ্চিম হিমালয়ের চূড়া, বিশেষ করে চো ইয়ুর অসাধারণ দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। সেখান থেকে পাথুরে দেয়াল বেয়ে ৫৮০০-৫৯০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প-২ স্থাপন করা হয়। এ পথে ১৯২০০ ফিট উচ্চতায় ২০-৩০ ফিটের একটি রক স্ল্যাব রয়েছে যাকে ইয়োলো টাওয়ার বলা হয়। এটিতে রোপ ফিক্সড করা থাকলেও আইস বুট পড়ে এই টাওয়ার বেয়ে উপরে উঠতে পর্বতারোহীদের বেশ কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়।

ক্যাম্প-২ থেকে তুষারে ঢাকা মাশরুমের মত গিরিশিরা ধরে এগিয়ে গিয়ে চূড়ার নিচে ঝুলে থাকা হিমবাহের ঠিক পাশে পৌঁছে দেয়। এখানেই ৬৩০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প-৩ স্থাপন করা হয়। সচরাচর পর্বতারোহীরা ৩ নম্বর ক্যাম্পটি আর স্থাপন করেন না, ক্যাম্প-২ থেকেই প্রায় হাজার মিটারের আরোহণের জন্য সামিটের উদ্দেশে বের হয়ে যান। ক্যাম্প-৩ স্থাপনের জায়গাটিতে রিজলাইনের সেরাক ভেঙে এভালাঞ্জ হবার সম্ভাবনা থাকায় বেশীরভাগ পর্বতারোহীই নিরাপত্তার কথা ভেবে এত দীর্ঘ সামিট পুশ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। ক্যাম্প-৩ থেকে প্রায় ৪০ ডিগ্রির মত মোটামুটি খাড়া তুষারে ঢাকা পথ ধরে একেবারে চূড়া পর্যন্ত পৌঁছানো যায়। এইসব কারনেই আমা দাবলাম পর্বতারোহীদের একাধারে শারীরিক, মানসিক ও কৌশলগত সক্ষমতা যাচাই করার সবচাইতে উপযুক্ত জায়গা বলে বিবেচিত হয়।

পর্বতারোহীদের টেকনিক্যাল ক্লাইম্বিংয়ের দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য আমা দাবলামকে তাই উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে অনেকে বিবেচনা করে থাকেন। এমনকি ৮ হাজার মিটার পর্বতের প্রচলিত পথগুলো থেকেও ৬৮১২ মিটার উচ্চতার এই পর্বতটিকে তার কাঠিন্যের কারণে সবাই সমীহ করেন। এই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়া ও নিজেকে দক্ষ পর্বতারোহী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য প্রতি বছর অনেক অভিযাত্রী শরতের শেষে এখানে ভিড় জমান।

উল্লেখ্য, তিন বছর আগেও তিনি একবার আমা দাবলাম আরোহণের চেষ্টা করেছিলেন। সেই অভিযানে ক্যাম্প-২ থেকে শারিরীক অসুস্থতা ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে চলে আসতে হয়েছিল। ইতোমধ্যে ৪ বার ৮ হাজার মিটার উচ্চতার চূড়ায় আরোহণ করে ফেলা পর্বতারোহী এম.এ. মুহিতের জন্য এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ অভিযান হতে যাচ্ছে।

‘আমা দাবলাম’ বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের ৩১তম পর্বত অভিযান হতে যাচ্ছে। অভিযানটিকে যৌথ ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করছে ইস্পাহানি টি লিমিটেড, ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড এবং চ্যানেল আই।

 

 

(Visited 1 times, 1 visits today)

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)