আমাদের পাহাড়ের ধ্বনি প্রতিধ্বনি: তুরুরুতু

গানের সুধা তো কমবেশি আমরা সকলেই শ্রবণ করি। কখনও কি মনে হয়েছে কোন একটা গানের সুর, তার কাল ও পাত্র বাদে কোন একটা স্থানকেও প্রতিনিধিত্ব করে? চোখ বন্ধ করলে সামনে ভেসে উঠে কোন বিশেষ ভূ-প্রকৃতি, শুনে মনে হয়, গানটা যেন কোন এক বিশেষ জায়গার? হ্যাঁ, অবশ্যই মনে হয়। এত আন্তর্জাতিকতার যুগে এসেও এখনও আমরা টের পাই অনেক গানের ধারার শিকড়ই প্রোথিত থাকে এর স্থানে।
সঙ্গীতের ক্ষেত্রে ভাষা যে অনেক সময়ই কোন দূরত্ব নয়, তার উদাহরণ খুঁজলে ভুরি ভুরি পাওয়া যাবে। সঙ্গীতের  বিশ্বায়নের ফলে, কোন ভাষার একটি শব্দও আয়ত্তে না থাকলেও, সঙ্গীতের নিজেস্ব গুণেই তা ভিন্ন ভাষাভাষীদের অন্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পৃথিবীর নানা স্থানে ছড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলো ও পর্বতারোহণ নিয়ে যত প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হচ্ছে, সেগুলার অনেকগুলার পটভূমিতে যে সঙ্গীত আয়োজন থাকে, সেদিকে খেয়াল করলেও বিষয়টা অনুভূত হবে।
আমাদের দেশের সবুজ পাহাড়গুলোতে নানা স্বতন্ত্র জাতির বসবাস। তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, রয়েছে নিজস্ব ভাষার গান। যার মধ্যে অনেক ভাষার গানের ব্যাপারে আমরা অনেকে অবগতই নয়। পাহাড়ের সুরে গাওয়া গুটিকয়েক বাংলা গানের খোঁজই আমরা হয়ত জানি। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন ভাষায় গান হয়েছে এবং হচ্ছে, প্রকাশিত হচ্ছে গানের অ্যালবাম। আবার অনেক ভাষার গানগুলো প্রায় হারিয়েও যেতে বসেছে। প্রচার ও সহজলভ্যতাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দাড়া করানো যেতে পারে।
পাহাড়ের মাটি থেকে উঠে আসা এইসকল গানের রয়েছে ভিন্নরকম মাহাত্ন্য। কারণ সে গান শুধু গান নয়, তা জাতি বা অঞ্চলের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ধারক, পাহাড়ের মানুষ, মানুষের আচার, ইতিহাস, ধর্ম, ঐতিহ্যের বাহক। নানান ভাষার গানে উঠে আসা চেনা ভৌগোলিক নামগুলো হঠাৎই আপনাকে আনন্দ দিবে। হয়ত কোন অচেনা গানের কথা-সুরে প্রেমে পড়ে যাবেন খুব সহজেই। যারা আমরা পাহাড় ভালবাসি, আমাদের সবুজ পাহাড়কে অনুভব করতে পারবেন আর একটু কাছ থেকে।

www.tururutu.com

ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমাদের পাহাড়ের বিভিন্ন ভাষার গানগুলোকে সংরক্ষণ ও ছড়িয়ে দিতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগের নাম তুরুরুতু.কম। ২০১৪ সালের শেষের দিকে যাত্রা শুরু করা এই উদ্যোগটি আমাদের পাহাড়ের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের গানের এক দারুন সংগ্রহশালা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। যার সংগ্রহ থেকে আপনি সহজে অনলাইনে বসেই শুনতে পারবেন গান, প্রয়োজনে গানগুলোকে করতে পারবেন ডাউনলোড।
তুরুরুতু.কম(www.tururutu.com) নিয়ে অদ্রি কথা বলেছে এরই উদ্যোক্তা নিকোলাই চাকমার সঙ্গে। তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারটি এখানে প্রকাশিত হল।

অদ্রি: তুরুরুতু.কমের শুরুটা কিভাবে? অর্থাৎ আমাদের পাহাড়ের বিভিন্ন ভাষার গানগুলোকে অনলাইনে একত্র করার যে ভাবনা, এটির সূচনা হল কীভাবে? এই উদ্যোগের পেছনের মানুষগুলোর ব্যাপারে জানতে চাই।

নিকোলাই চাকমা: প্রথমে বলে রাখি তুরুতুরু.কম সম্পূর্ণ অবাণিজ্যিক একটি ওয়েব সাইট। আমাদের এলাকায় বসবাসরত পাহাড়ীদের(চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা আরো অন্যান্য বসবাসকারীদের) ঐতিয্যবাহী স্থানীয় গান, পালা, ওলি(ঘুম পাড়ানি গান) গেঙহুলী প্রচলিত আছে। সে সমস্ত গানগুলি বা সুরগুলিকে লালন না করার ফলে খুব দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। বলতে পারেন প্রায় নেই। অথচ এ সমস্ত গানগুলি একটা স্বতন্ত্র্য জাতির বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে। এরকম ঐতিয্যবাহী গানগুলি সংগ্রহ করে রাখা এবং একদম বিনে পয়সায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে আগ্রহীদের মাঝে পৌঁছে দেওয়ার মত একটা ওয়েবসাইট করার ইচ্ছা ছিল ৪/৫ বছর আগে থেকে। গত নভেম্বর, ২০১৪ তে তুরুরুতু.কম যাত্রা করে।

এই সাইটটির সার্বিক কর্মসম্পাদন আমি নিজে করি। গান সংগ্রহ করা থেকে ওয়েবসাইটটার কাস্টোমাইজেশন, প্রেক্ষাপট ডিজাইন, কনটেন্ট লেখাসহ সব কাজ আমি একা করে থাকি।

নিকোলাই চাকমা

অদ্রি: তুরুরুতু নামটির ব্যাপারে যদি কিছু বলতেন।

নিকোলাই চাকমা: তুরুরুতু নামটি আমার দেওয়া। যার অর্থ বাঁশির সুর। যে সুর পাহাড়ে ধ্বনি প্রতিধ্বনি হয়ে ফেরে।

অদ্রি: তুরুরুতুর প্রধান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যগুলো কি কি?

নিকোলাই চাকমা: আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য ঐ একটাই, সেটা হল আমাদের আদিবাসীদের গানগুলিকে নিয়ে ইন্টারনেট ভিত্তিক একটি সংগ্রহশালা তৈরি করা, যার মাধ্যমে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপিত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের সংস্কৃতির একটি শাখাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

লক্ষ্য আছে অনেক কিছু। কিন্ত সবার আগে গানগুলিকে গুছিয়ে নিয়ে একটি শৃঙ্খলা দিতে চাই। যাতে করে গানগুলি হারিয়ে না যায় এবং খুব সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ গানগুলি এমনভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে যে, কোন একটি গান খুঁজতে গেলে খুব সহজে পাওয়া যায় না। সে গানগুলি গুছিয়ে নিয়ে আসাটা সত্যি অনেক সময়ের ব্যাপার। যেমন, ‘উত্তোন পেগে মেগে মেগে’ একটা জনপ্রিয় গান। অথচ মূল শিল্পি কে, গীতিকার কে, সুরকার কে কেউ জানে না। জানার উপায়ও নেই। কারণ বর্তমানে ডিজিটাল সিস্টেম হওয়াতে এরকম হাজার হাজার গান মোবাইলে, কম্পিউটারে নেওয়া থাকে কিন্তু গীতিকার, সুরকার বা শিল্পির নাম, কোন অ্যালবাম থেকে এসেছে সে অ্যালবামের নাম সেখানে থাকেনা। এই জিনিসগুলি গুছানোর কাজটা সবার আগে করতে চাই।

অদ্রি: এখন পর্যন্ত কয়টি ভাষার গান/সঙ্গীত আপনাদের সংগ্রহে আছে? সেই ভাষাগুলা কি কি?

নিকোলাই চাকমা: এখন পর্যন্ত চাকমা ভাষা, মারমা ভাষা, ত্রিপুরা ভাষা, বম ভাষা এবং তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় গান কিছু পাওয়া গেছে, সেগুলি সংগ্রহে আছে। ধীরে ধীরে সব আদিবাসীদের গানগুলিকে সংগ্রহে রাখা হবে।

অদ্রি: গানের অ্যালবামগুলো আপনারা কিভাবে সংগ্রহ করেন? অর্থাৎ শিল্পীদের কাছ থেকে সঙ্গীত/গান নেবার ক্ষেত্রে কি ধরনের কর্মপ্রণালী অনুসরণ করে তুরুরুতু?

নিকোলাই চাকমা: শিল্পি, প্রডিউসার, গীতিকারদের কাছে আমি সরাসরি গিয়ে তুরুরুতু.কমের কার্যক্রমের কথা বলেছি। সবাই সাধুবাদ দিয়েছেন এবং এগিয়ে নিতে কোন প্রকার প্রয়োজন হলে তাদেরকে অবহিত করার জন্যও বলেছেন। তারা তাদের কাছে সংগ্রহে থাকা ক্যাসেট, অডিও সিডি দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করেছেন।  আমাকে এবং তুরুরুতু.কমকে কয়েকজন শিল্পীর, গীতিকার, সুরকারের প্রত্যয়ন করেছেন। আপনি ওয়েব সাইটে গিয়ে থাকলে হয়তবা দেখে থাকবেন। অনেকের দেওয়া প্রত্যয়নগুলি প্রদর্শিত হচ্ছে। তবে সবার সাথে দেখা করে প্রত্যয়ন নেওয়াটাও সম্ভব হয় না। কারণ আমাদের গানগুলি করা হয় খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং বান্দরবানে। নিজের কর্মজীবন ফেলে ঢাকা থেকে গিয়ে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করাটা আসলে সবসময় সম্ভব হয়না। তবে প্রায় সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে গানগুলি ওয়েবে দেয়ার ক্ষেত্রে মৌখিকভাবে, টেলিফোনে এবং লিখিতভাবে সম্মতি নেওয়া আছে। সময় ও সুযোগ পেলে সবার সাথে দেখা করে তাদের কাছ থেকে প্রত্যয়ন নেয়া হবে।

অদ্রি: এই উদ্যোগটি সচল রাখার ক্ষেত্রে তুরুরুতু’কে কি কোন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে?

নিকোলাই চাকমা: একটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে গানগুলিকে সংগ্রহ করা। এছাড়া তেমন প্রতিবন্ধকতা এখনো সম্মুখীন হতে হয়নি। আগেই বলেছি, গানগুলি এমনভাবে এত  জটিলভাবে ছড়িয়েছে যে গানগুলি কিভাবে, কোথা থেকে, কোন অ্যালবামের বলাটা অসম্ভব। আগে তো ডিজিটাল বা সিডি বা ডিভিডি ছিলনা তখন ক্যাসেটে পাওয়া যেত। সেই ক্যাসেটগুলি তো এখন চলে না। ফলে যারা সে সময়ে ক্যাসেট কিনতেন, রেকর্ড করে রাখতেন সিডি, ডিভিডি প্রভাব আসার পরে তারা ক্যাসেটগুলি ফেলে দিয়েছেন। ফলে সে গানগুলি পাওয়াটা একটু কষ্ট হচ্ছে। খুশির কথা সে সময়কার গানগুলি বর্তমানে নতুন করে গাওয়া হচ্ছে। তবে মূল গানের যে মাধুর্য, যে সুর, বর্তমানে পুন:উৎপাদন করা গানগুলির মধ্যে খুব অল্প পরিমাণ পাওয়া যায়। তুরুরুতু.কম মূল গান এবং মূল শিল্পির কণ্ঠের গানগুলি সংগ্রহ করতে চায়। সেটা ক্যাসেট আকারে কিংবা ডিজিটাল ফরমেটে যেভাবে হোক সে গানগুলি পেলে সংরক্ষণ করা হবে। কিন্তু খুব কম পাওয়া যাচ্ছে। তবে আশা করি সংগ্রহ করতে পারবো হয়ত বা একটু সময় লাগবে আর কি।

যেহেতু আমি একা একা কন্টেন্ট লেখা, আপলোড করা, এডিট করা, কনভার্ট করাসহ আরও অনেক ছোট ছোট কাজ আছে সে কাজগুলি করি সেহেতু তুরুরুতু.কমকে নিয়ে এগিয়ে যেতে একটু বেগ পেতে হচ্ছে। এগিয়ে যাওয়াটা একটু ধীরগতির হচ্ছে।

অদ্রি: ভবিষ্যতে আপনাদের এই উদ্যোগ বিস্তারে কোন নতুন চিন্তা বা পরিকল্পনা আছে কি?

নিকোলাই চাকমা: সেরকম চিন্তাভাবনা আছে। যদি ওয়েব সাইটের কনটেন্টগুলি গুছিয়ে আনতে পারি, যদি তুরুরুতু.কমকে আপটু ডেট করতে পারি তাহলে ঐতিয্যবাহী গানগুলি (ঘুম পাড়ানি গান)সহ অনেক দুর্লভ গানগুলিকে নতুন নতুন অনেক উদীয়মান সঙ্গীত শিল্পী আছেন, প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীত শিল্পী আছেন তাদেরকে নিয়ে অডিও সিডি বের করার পরিকল্পনা আছে। তুরুরুতু.কমের মাধ্যমে যদি কেউ/কোন প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল অডিও/ভিডিও প্রডাক্ট বিক্রি করতে চায় সে ক্ষেত্রে তুরুরুতু.কম সহযোগিতা করবে।

অদ্রি: কোন ভাষাগুলোর গান নিয়ে বেশি কাজ হয়েছে এবং কোন কোন ভাষার গানগুলো নিয়ে কম কাজ হয়েছে? তুরুরুতুর জন্য কাজ করতে গিয়ে আপনাদের কি মনে হয়?

নিকোলাই চাকমাআমাদের এলকায় চাকমা ভাষায় যত না কাজ হয়েছে সে পরিমাণ অন্য কোন ভাষার হয়নি। যেহেতু চাকমা ভাষায় অডিওগুলি খুব সহজে পাওয়া যাচ্ছে সেহেতু চাকমা গান নিয়ে বেশি কাজ করা হয়েছে। মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম এবং চাক গানের কিছু কিছু কাজ হয়েছে বাকিদের যেমন: খুমী, মুরঙের অনেকের গান পাইনি।

তুরুরুতু.কম যেহেতু আমার আগ্রহের একটি ফসল, সেহেতু আনন্দের সাথে কাজগুলি করি। নিজের পকেটের ২/১ পয়সা খরচ হলেও ওয়েব সাইটটিকে ডেভেলপ করার চিন্তা করি। সামনে আমাদের বিজু/বিহু/সাগ্রাই/বৈসুক উৎসব আসছে সে বিজুকে ঘিরে নতুন নতুন অডিও, ভিডিও এ্যলবাম হচ্ছে আশা করি পুরানো গানের সাথে নতুন গানের মুর্ছনায় তুরুরুতু.কম ভরে উঠবে এবং শ্রোতাদের কাছে তাদের প্রিয় শিল্পির গানগুলিকে পৌঁছে দিতে পারব। যারা দেশের বাইরে আছেন তাদের ইচ্ছে হলেও এখানকার গানগুলিকে, নিজের পছন্দের গানগুলিকে কাছে পান না বিশেষ করে তাদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। সবসময় বিদেশের মাটিতে দেশীয় আবেশ পৌঁছে দিতে চাই। সকল গানপ্রেমী শ্রোতা, ভিজিটর, শিল্পি, সুরকার, গীতিকার, প্রডিউসারকে তুরুরুতু.কম নির্মল কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।

অদ্রি: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।  

নিকোলাই চাকমাঅদ্রিকে এবং অদ্রির সংশ্লিষ্ট সকলকে বিজু, ২০১৬ এর আগাম শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।


সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়েছে ৩ মার্চ, ২০১৬।

(Visited 1 times, 1 visits today)
অদ্রি সম্পাদক
অদ্রি সম্পাদক
সম্পাদকরাও একেকজন পাঠক।

৪ thoughts on “আমাদের পাহাড়ের ধ্বনি প্রতিধ্বনি: তুরুরুতু

  1. কতদিন ধরে যে এমন গানগুলি খুঁজেছি তার ইয়ত্তা নেই। অত্যন্ত ভাল একটি উদ্যোগ। এরপর পাহাড়ে গেলে ওদের গান নিয়েই যাওয়া যাবে!

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)