আইগারের উত্তুরে মৃত্যু প্রাচীর (পর্ব ১)


অনাদিকাল থেকে সুউচ্চ পর্বতের ভয়ংকর রূপ বিমোহিত করেছে মানুষকে। আকাশছোঁয়া কাঠামোগুলোর দুর্গম আর রহস্যময় বাঁকে-দেয়ালে কল্পনার জাল বুনে প্রাচীন মানুষ রচনা করেছে অজস্র পুরাণ আর গল্পগাঁথা। সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে পুরাণের কল্পনাতেই আর থেমে থাকেনি মানুষের বিচরণের সীমানা; বরঞ্চ আরও বহুগুণ বেশি রোমাঞ্চকর বাস্তবিক নেশায় বুঁদ হয়েছে সে। অজানা দুর্গম বিপদসঙ্কুল পথে পায়ের ছাপ এঁকে কল্পনার চূড়ায় সত্যিকার রক্তমাংসের উপস্থিতি জানান দিয়ে নিজেকে সে করতে চেয়েছে মহিমান্বিত। তবে এমন গৌরব তো আর এত সহজে ধরা দেবার নয়, পায়ে পা মিলিয়ে সবসময়ই তার সাথে চলেছে ভয়াল মৃত্যুর বিভীষিকা।

আল্পস পর্বতমালার আইগার (৩,৯৭০ মিটার / ১৩,০২০ ফুট) ঠিক এমনই এক পর্বত। আরেকটু ভাল করে বললে আইগারের উত্তর-পশ্চিম পাশ; এক কথায় বোঝানোর জন্য যাকে উত্তুরে প্রাচীর বা নর্থ ফেইস বলে ডেকে থাকেন পর্বতপ্রেমীরা। যুগে যুগে আইগারের উত্তুরে প্রাচীর হাতছানি দিয়ে ডেকেছে পর্বতারোহীদের। নেশাতুর চোখে পর্বতারোহীরা স্বপ্ন দেখেছেন ওই খাঁড়া উত্তুরের দেয়াল বেঁয়ে উঠে তার দাম্ভিক চূড়াকে পদানত করার; উদ্ধত ওই গিরিশিখরে দাঁড়িয়ে নতুন চোখে নিচের দুনিয়াটাকে দেখার।

১৯৩৬। তখনও পর্যন্ত উত্তর দিক থেকে আইগারের সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছতে পারেনি কোন মানব সন্তান। এমন নয় যে আইগারের চূড়া তখনও অজেয়। পশ্চিম পাশ থেকে চূড়ায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল আরও মোটামুটি বছর আশি আগেই, সেই ১৮৫৮ তে। কিন্তু দুঃসাহসী পর্বতারোহীরা সবসময়ই চেয়েছেন নতুন কিছু করতে। চূড়ায় উঠবার এমন সব পথ খুঁজে ফিরেছেন যা সাধারণের কাছে কখনও পাগলামি, কখনও বা নিজ হাতে মৃত্যুকে ডেকে আনার মত উন্মাদনার সামিল। এমন পথ, যা সাধারণত কেউ মাড়াবার কথা ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করবে না। এমন কিছু, যা নির্ধারণ করবে মানুষের সক্ষমতার নতুন সীমানা, রচনা করবে মানব সাফল্যের নতুন ইতিহাসের জয়গাঁথা।

কখনোই সরাসরি সূর্যালোক না পাওয়া
উত্তুরের ভেজা এবং শীতল দেয়ালটা
মৃত্যুরই আরেক নাম যেন।

বিখ্যাত বলুন বা কুখ্যাত, আল্পস পর্বতমালার সবচেয়ে আলোচিত তিনটি উত্তুরে দেয়াল হল, আইগার, ম্যাটারহর্ণ এবং গ্রাঁ জোরাস। একসাথে এদের বলা হয় ত্রয়ী (The Trilogy)। আল্পসের এই তিনটি পর্বতের উত্তর দেয়ালই পর্বতারোহীদের কাছে চরম আরাধ্য তাদের দুর্গমতার কারণে। এর ভেতর আইগারের উত্তুরে দেয়াল আরও বেশি আলোচিত বাকিগুলোর চেয়ে তার বেশি উচ্চতা আর একই সাথে দুর্গমতার কারণে। অত্যন্ত কুশলী ক্লাইম্বারদের পক্ষেই যা শুধুমাত্র বাঁওয়া সম্ভব। তার সাথে আরেকটা আবশ্যিক জিনিস হচ্ছে ভাল আবহাওয়া।

ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে আইগারের উত্তর পাশটার ধারে কাছে তেমন কোন পর্বতও নেই। চূড়া থেকে উত্তুরের দেয়াল প্রায় খাঁড়া নেমে গেছে প্রায় ১,৮০০ মিটার (৫,৯০০ ফুট)। উত্তুরের বয়ে আসা বাতাস তাই কোনো রকম বাধা ছাড়া সরাসরি এই দেয়ালে এসে প্রতিনিয়ত বাড়ি খায়। উত্তুরে দেয়াল আকৃতিতে অবতল অর্থাৎ ভেতরের দিকে দেবে গেছে, এমন অনেকটা। বাতাস তাই এর গায়ে এসে আছড়ে পড়েই ঠিক পাশ কেটে বেরিয়ে যেতে পারে না, পাল্টি খেয়ে খেয়ে ভেতরদিকে দেবে যাওয়া পুরো উত্তর পাশ জুড়ে ক্রমাগত ঘুরে শক্তভাবে তার উপস্থিতি জানান দিয়ে তবেই বের হয়। এবারে কল্পনা করুন, উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা কোন ঝড় এই দেয়ালে আঘাত হানলে পরিস্থিতি কেমন প্রলয়ঙ্করি হতে পারে। অনেকে ব্যাপারটা তুলনা করে থাকেন কোন থুরথুরে বৃদ্ধের শুকনো কাশির দমকের চোটে বুকের খাঁচা অনবরত ফুলে ওঠার।

সাধারণ আবহাওয়াতেই দমকা বাতাসে উত্তর দেয়ালের অনেক জায়গা বেঁয়ে পাথর, বরফ বা বরফগলা পানিতে ট্রেইল পিচ্ছিল হয়ে থাকা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। ঝড়ের সময় এই দিকটা ঘোর কুয়াশা, প্রচণ্ড বাতাস, মুহূর্মুহূ পাথরধ্বস আর ভয়াবহ তুষারধ্বসে আক্ষরিক অর্থেই নরক হয়ে ওঠে। ওপরে উঠতে গিয়ে কেউ যদি এমন ঝড়ের মাঝে পড়ে যায়, তার বেঁচে যাবার সম্ভাবনা আসলেই খুব সামান্য। কখনোই সরাসরি সূর্যালোক না পাওয়া উত্তুরের ভেজা এবং শীতল দেয়ালটা মৃত্যুরই আরেক নাম যেন। সেই তিরিশের দশকের প্রথম প্রচেষ্টার সময় থেকে আজকের দিন পর্যন্ত এই উত্তুরের দেয়ালে মৃত পর্বতারোহীর সংখ্যা প্রায় সত্তর ছুঁয়েছে। জার্মান ভাষায় তাই উত্তুরে প্রাচীরের (নর্ডভান্ড) আরেক নাম হয়েছে মৃত্যুর প্রাচীর (মর্ডভান্ড)।

আইগারের এই দিকটির আরেকটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের কথা না বললেই নয়। এর উত্তুরে দেয়ালের ঠিক পাশেই, নিচের উপত্যকায় অবস্থিত ছোট্ট সুইস শহর গ্রিন্ডেলভাল্ড। এখানকার উত্তরমুখী হোটেল, রেস্টুরেন্ট বা লজগুলোর বারান্দায় আয়েশ করে বসে চারপাশের বরফে ঢাকা পাহাড়সারির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য উপভোগ করবার পাশাপাশি আগত ট্যুরিস্টরা আরও পাবেন আইগারের খাঁড়া উত্তুরে দেয়ালে পর্বতারোহীদের মঞ্চস্থ রুদ্ধশাস ‘নাটক’ দেখবার দুর্লভ সুযোগ। তফাৎ শুধু এই যে, এই নাটক বড় বেশি বাস্তব; যার পাণ্ডুলিপির হদিস কারও কাছে নেই। নাটকের দৃশ্যগুলো চিত্রায়িত হয় জীবন আর মৃত্যু নামক দাপুটে দুই কুশীলবের প্রচ্ছন্ন উপস্থিতিতে। সবকিছু মিলিয়ে প্রতি বছর আরোহণের মৌসুমে তাই একই সাথে অভিযাত্রী, উৎসুক পাহাড়প্রেমী, সাংবাদিক আর নিছক সাধারণ ট্যুরিস্টদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে ছোট্ট গ্রিন্ডেলভাল্ড। পর্বতারোহণের এমন থিয়েটার পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না। সেই তিরিশের দশকে উত্তুরে দেয়াল আরোহণের প্রথম প্রচেষ্টার সময় থেকে আজ পর্যন্ত সবকটি ট্র্যাজেডি আর জয়গাঁথা প্রত্যক্ষ করেছেন আইগার নামক থিয়েটারের গ্যালারী, গ্রিন্ডেলভাল্ডে জড়ো হওয়া দর্শকেরা।

উত্তরদিক থেকে আইগারের চূড়ায় যাবার প্রথম প্রচেষ্টা করেছিলেন উইলি বেক, কার্ট লৌভিঙ্গার এবং জর্জ লৌভিঙ্গার ১৯৩৪ সালে। তারা ২,৯০০ মিটারের পরে আর উঠতে পারেননি।

ঠিক পরের বছরই (১৯৩৫) দ্বিতীয় প্রচেষ্টা চালান দুই ব্যাভারিয়ান জার্মান ক্লাইম্বার কার্ল মেহরিঙ্গার এবং ম্যাক্স সেইডলমায়ার। গ্রিন্ডেলভাল্ড এসে তারা দেখেন আবহাওয়া মোটেই যাত্রা শুরুর পক্ষে নয়। বেশ কদিন অপেক্ষার আকাশ পরিষ্কার হলে তারা পা রাখেন উত্তুরে প্রাচীরে। গিন্ডেল্ভাল্ডের উৎসুক দর্শনার্থীরা চোখ রাখেন দূরবীক্ষণে।

প্রথম দিনটি নির্বিঘ্নেই কেটে যায়। প্রায় ২,৮০০ মিটারেরও (৯,৪০০ ফুট) বেশি উচ্চতায় প্রথম রাতের জন্য বিভোয়্যাক করেন তারা। বিভোয়্যাক মানে হচ্ছে তাঁবু ছাড়া অন্য কোন উপায়ে অস্থায়ী ছাউনিতে আশ্রয় নেওয়া। পরের দুটো দিন খাঁড়া উত্তুরে দেয়াল বেঁয়ে তাদের আরোহণ অব্যাহত থাকে। যদিও পথ আরও কঠিন হয়ে যাবার কারণে প্রথম দিনের তুলনায় তারা খুব বেশি উচ্চতা অতিক্রম করতে পারেননি। তৃতীয় রাতে নর্থ ফেইসে আঘাত হানে তুফান, শুরু হয় তুষারপাত। ঘন কুয়াশার চাদরে আইগার নিজেকে ঢেকে নেবার আগে নিচের শঙ্কিত দর্শকেরা দেখেন উত্তর প্রাচীরের জায়গায় জায়গায় ঢাল ভেঙে নামছে জমে থাকা বরফের স্তূপ। যাকে আমরা বলি তুষারধ্বস। আশঙ্কা আর উৎকণ্ঠায় আরও দুটো দিন কেটে যাবার পর পঞ্চম দিন সামান্য সময়ের জন্যে কুয়াশার ঘোমটা সরে যায়। অভিযাত্রী দুজনকে পঞ্চম দিনের মত বিভোয়্যাকের প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়। গত দুদিনের তুফানের চোটে খুব বেশি আর উঠতে পারেননি তারা। ততক্ষণে আবার কুয়াশায় ঢেকে যায় সব। পরের বেশ কটা দিন ধরে চলতে থাকে তুফানের তাণ্ডব। পুরোটা সময় ঘন কুয়াশা সম্পূর্ণ অন্ধ করে রাখে নিচের উদ্বিগ্ন জনতাকে।

অবশেষে তুফান থামে। ঝকঝকে আবহাওয়ায় দেখা যায় সাদা বরফে ঢাকা আইগারের উত্তুরে প্রাচীর। কিন্তু বহুক্ষণ চেষ্টা করেও দুরবীক্ষণে কোনরকম নড়াচড়া খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন দর্শনার্থীরা। আরও বেশ কিছুদিন পরে মেহরিঙ্গার আর সেইডলমায়ারের মরদেহ আবিষ্কৃত হয় প্রায় ৩,৩০০ মিটার উচ্চতায়। প্রবল তুফানে আটকা পড়ে দুই অভিযাত্রী জীবনের শেষ কটা দিন কাটিয়েছেন অচলাবস্থায়। ওই পরিস্থিতিতে ওপরে বা নিচে কোন দিকেই যাওয়া সম্ভব ছিল না; প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে মৃত্যু হয় দুজনের। তাদের স্মরণে সেই জায়গাটিকে এখন ‘মৃত্যু ছাউনি’ (Death Bivouac) নামে ডাকা হয়।

ক্রীড়া হিসেবে পর্বতারোহণ মূলত ব্রিটিশদের
হাত ধরে শুরু হলেও জার্মান পর্বতারোহীরা ততদিনে
আল্পসে তাদের নৈপুণ্য আর সাফল্যের স্বাক্ষর
রাখতে শুরু করেছেন।

জীবনের অন্তিম কটা দিন কি ভেবে কাটিয়েছিলেন তারা? হয়ত আশায় বুক বেঁধেছিলেন ঝড়ের বেগ কমবে ভেবে; কিন্তু অক্ষম আক্রোশে নিজেদের প্রাণ সমর্পণ করতে হয়েছে মৃত্যুদূতের কাছে। পরিস্থিতি একটু ভাল হলেই হয়ত নিরাপদে নেমে আসতে পারতেন তারা। কিংবা যদি কোনো ঝড়ই না হত? হয়ত আইগারের ইতিহাস আজ অন্যভাবে লিখতে হত, কে জানে!

এই ঘটনা সারা ইউরোপজুড়ে তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়। পর্বত অভিযানে মানুষের মৃত্যু ততদিনে নতুন কিছু না হলেও সাধারণ মানুষ এভাবে সরাসরি কখনও দেখেনি খেলাচ্ছলে পাহাড়কে মানুষের জীবন কেড়ে নিতে। এমন সময়ে এই ঘটনাটি ঘটে যখন আল্পসের দুর্গম সব পর্বতচূড়ায় নানাদিক থেকে পর্বতারোহীদের পা পড়তে শুরু করেছে। পর্বতারোহী মহলে আলোচনার মূল বিষয় হয়ে ওঠে মেহরিঙ্গার আর সেইডলমায়ারের এই অভিযান। ইউরোপের তৎকালীন সেরা পর্বতারোহীদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় আইগারের উত্তুরে প্রাচীরে। তৎকালীন দুনিয়ার দুই পরাশক্তি জার্মানি আর ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি আলোচনায় আসে অনিবার্যভাবে। ক্রীড়া হিসেবে পর্বতারোহণ মূলত ব্রিটিশদের হাত ধরে শুরু হলেও জার্মান পর্বতারোহীরা ততদিনে আল্পসে তাদের নৈপুণ্য আর সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেছেন। দুর্গম পর্বতে মানুষের কৃতিত্বকে রাষ্ট্রীয় মুকুটে মহিমার পালকরূপে গুঁজে দেবার সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। যদিও পর্বতারোহীদের এসব নিয়ে মাথাব্যাথা ছিল না তেমন। সত্যিকার পর্বতারোহীর কাছে আরেকটি দুর্গম পর্বত মানেই আরেকটি নতুন চ্যালেঞ্জ, লক্ষ্য যেখানে শুধু নিজের সামর্থ্যকেই ছাড়িয়ে যাবার।

বছর গড়িয়ে চলে আসে ১৯৩৬ সালের গ্রীষ্মকাল, আরোহণের মৌসুম। গিন্ডেলভাল্ডে আবার শুরু হয় পর্বতারোহীদের আনাগোনা। সেবার মোট দশ জন জার্মান আর অস্ট্রিয়ান ক্লাইম্বার জড়ো হন আইগারের নর্থ ফেইসের নিচে। কেউ একজন ওঠা শুরু করার আগেই প্রস্তুতিমূলক আরোহণের সময় দূর্ঘটনায় প্রাণ হারান। হঠাৎ করেই আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করে। বেশ কিছুদিনেও অবস্থা উন্নতির কোনরকম লক্ষণ না দেখে কয়েকজন সে যাত্রায় ওপরে ওঠার আশা বাদ দিয়ে গ্রিন্ডেলভাল্ড ছাড়েন।

একে একে সবাই চলে গেলেও চারজন থেকে যান – দুই ব্যাভারিয়ান জার্মান আন্দ্রেয়াস হিন্টার্স্টোয়াইজার, টোনি কুর্জ এবং দুই অস্ট্রিয়ান উইলিইয়াম অ্যাঙ্গারার, এডি রায়ানার। তেইশ বছর বয়সী কুর্জ এবং তার বাল্যবন্ধু একুশ বছর বয়সী হিন্টার্স্টোয়াইজার ছোটবেলা থেকেই পাহাড়ের নেশায় মজেছিলেন। দুজনে মিলে আল্পসের অনেকগুলো চূড়ায় প্রথম মানব হিসেবে সফলভাবে পা রাখেন যার ভেতর কয়েকটি অত্যন্ত দুর্গম হিসেবে বিবেচিত হত। আল্পসের এই চূড়াগুলো ছিল ব্যাভারিয়ায় বার্খতেসগ্যাডেন রেঞ্জ এবং জার্মান-অস্ট্রিয়ান বর্ডারে রীটার রেঞ্জের ভেতর। অনন্য এসব কীর্তির কারণে দুজনকেই সে সময় পৃথিবীসেরা পর্বতারোহীদের কাঁতারে ফেলা হত। দুজনেই তৎকালীন জার্মান সম্মিলিত সামরিক বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি দুজনেই আবার আল্পসের ব্যাভারিয়ান রেঞ্জের পর্বতগুলোতে গাইড হিসেবে কাজ করতেন। কর্মস্থল বার্খতেসগ্যাডেন থেকে বাইসাইকেলে ৬২৮ কিলোমিটারের লম্বা শ্রমসাধ্য পথ পাড়ি দিয়ে গ্রিন্ডেলভাল্ড পৌঁছান তারা। অপরদিকে অস্ট্রিয়ান উইলিইয়াম অ্যাঙ্গারার এবং এডি রায়ানারও মেধাবী পর্বতারোহী হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছিলেন তাদের নৈপুণ্যের কারণে।

দুই দলই আবহাওয়া ভাল হবার জন্য অপেক্ষা করার ফাঁকে উত্তুরে দেয়ালটি নানাদিক থেকে রেকি করতে শুরু করেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করার চেষ্টা করতে থাকেন ঝুঁকিপূর্ণ এই দেয়াল বেঁয়ে ওঠার ‘সহজতম’ পথটি। এই প্রস্তুতির সময় নিচের দিকের একটি ঢাল থেকে হিন্টার্স্টোয়াইজার প্রায় ১২১ ফুট নিচে পড়ে গিয়েও সৌভাগ্যক্রমে অক্ষত থাকেন। আর কিছুদিনের ভেতরেই আবহাওয়া ভাল হতে শুরু করলে জার্মান আন্দ্রেয়াস হিন্টার্স্টোয়াইজার এবং টোনি কুর্জ তাদের যাত্রা শুরু করেন জুলাইয়ের এক ভোররাতে। কিছুক্ষণ পরেই উইলি অ্যাঙ্গারার এবং এডি রায়ানারও একই পথে ওঠা শুরু করেন। তারা আরোহণ করছিলেন আল্পাইন কৌশলে অর্থাৎ আগে থেকে লাগিয়ে রাখা কোনরকম দড়ির সহায়তা ছাড়া। সকাল হলেই গ্রিন্ডেলভাল্ডের দর্শনার্থীরা দেখতে পান এক অভূতপূর্ব দৃশ্য – চার অভিযাত্রী তরতর করে উঠে যাচ্ছেন আইগারের দানবীয় উত্তুরে প্রাচীর বেঁয়ে। তাদের পদক্ষেপে ঠিকরে পড়ছিল আত্মবিশ্বাস। উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই চারজন যেন জানতেন ঠিক কিভাবে এগোলে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।

প্রায় মাঝামাঝি উচ্চতায় ওঠার পর চারজন প্রথম কঠিন বাঁধার সম্মুখীন হন, প্রায় ১,৫০০ ফুট উচ্চতায়। একদম প্রায় মসৃণ পাথুরে একটি স্ল্যাব। প্রায় ১৫ ফুট চওড়া সেই পাথুরে জায়গায় এমন কোন খাঁজ নেই যাতে পিটন লাগিয়ে দড়ির সাহায্যে বা অন্য কোনভাবে পার হওয়া যাবে। নিচেই একেবারে খাঁড়া ঢাল নেমে গেছে আইগারের প্রায় তলদেশ পর্যন্ত। খানিকক্ষণ পরে আন্দ্রেয়াস হিন্টার্স্টোয়াইজার একটি বুদ্ধি বের করেন। পাথরের খাঁজ বেঁয়ে খানিকটা ওপরে উঠে গিয়ে কোন একটি খাঁজে পিটন গাঁথেন তিনি। তারপরে দড়ির সাহায্যে নিম্নমুখী গতিকে কাজে লাগিয়ে অনেকটা পেন্ডুলামের মত করে আড়াআড়ি সামনে বাড়েন, পর্বতারোহণের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ট্রাভার্স। কৌশলগত দিক থেকে ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে সহজ ছিল না। জায়গাটা আকৃতিতে উত্তল হওয়ায় ওপারে কি ছিল না জেনেই পা বাড়াবার ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। দুর্দান্ত রক ক্লাইম্বার হিসেবে পরিচিত হিন্টার্স্টোয়াইজারের তাৎক্ষণিক বুদ্ধির কল্যাণে পার হয়ে গেলেন জায়গাটা। আরেকদিকে উনি পিটন গেঁথে দিলে এবারে সহজেই দড়ি স্থাপন করে জায়গাটি পার হয়ে গেলেন বাকি তিনজনও। হিন্টার্স্টোয়াইজারের অসাধারণ নৈপুণ্যকে সম্মান জানিয়ে পরবর্তীতে ওই জায়গাটির নাম দেয়া হয় হিন্টার্স্টোয়াইজার ট্রাভার্স।

হিন্টার্স্টোয়াইজার ট্রাভার্স পার করেই দলটি প্রথম আইসফিল্ডের ডান কিনার ধরে উঠতে শুরু করেন। ট্রাভার্স এলাকা ছেড়ে যাবার সময় দড়িটাও খুলে নিয়ে যান তারা। এপারে এমন কোনো জায়গা ছিল না যেখানে ওপরে দড়ি লাগিয়ে ঠিক আগের মত করে নিম্নমুখী গতিতে ফেরত যাওয়া যাবে। তাই দড়ি খুলে ফেলবার সাথে সাথেই ঐ পথে ফিরে যাবার রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তাদের। এমন কাজ তাহলে কেন করতে গেলেন তারা? একটু ভাবলেই উত্তরটা পাওয়া যায়-আত্মবিশ্বাস। ঘুণাক্ষরেও তারা ভাবেননি ওই পথে আবার তাদের ফিরে আসতে হতে পারে। এমন একটা জায়গায় তারা পৌঁছে গিয়েছিলেন যেখান থেকে সামিট করাও খুব সম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল। আর সামিটের পরে নেমে যাবার জন্যে আরও সহজ অন্য পথ তো রয়েছেই!

(অসমাপ্ত)


পড়ুন পর্ব ২ 


অনুপ্রেরণায় 

১. Louise Osmond. The Beckoning Silence. 2007 Documentary Film

২. Steve Robinson. Eiger: Wall of Death. 2010 Documentary

[ছবি]

১. Kleine Scheidegg mit Eigernordwand by Ch-info.ch licensed under CC BY 3.0

২. The features of the north face of the Eiger  by Gdr and Lupo  licensed under CC Attribution-Share Alike 3.0 Unported

 

(Visited 1 times, 1 visits today)
মিলন বাকী বিল্লাহ
মিলন বাকী বিল্লাহ
জীবনযুদ্ধে ব্যস্ততার ভিড়ে একটু হাঁফিয়ে উঠলেই ছুটে চলে যান পাহাড়ে। প্রকৃতির সাথে সাথে পাহাড়ের মানুষের সাথে মিশতে ও তাদের জীবন সম্পর্কে জানতে ভালোবাসেন।

৭ thoughts on “আইগারের উত্তুরে মৃত্যু প্রাচীর (পর্ব ১)

  1. নর্থ ফেস নামে একটা জার্মান মুভি আছে এই এক্সপিডিশন এর কাহিনী নিয়ে। এক কথায় অসাধারণ।

    1. মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

      নর্থ ফেইস সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত। সেখানে আসল ঘটনা থেকে কিছুটা দূরে সরে যাওয়া হয়েছে। যেমন, বাস্তবে টোনির প্রেমিকা/বাান্ধবী কোন উপস্থিতি ছিল না যেটা সিনেমাতে দেখানো হয়েছে।

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)