অধরা স্বপ্ন

[শেষ বিকালের আলোয় রাঙা কাং ইয়াৎসে। ছবি: তন্ময় সজীব]

কি করছি আমি এখানে? রুক্ষ কঠিন এবড়ো থেবড়ো পাথরে ঠিকরে পরা সূর্যের আলোয় ঝলমল করতে থাকা উপত্যকার দিকে ক্লান্ত আর শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তন্দ্রার মত চলে এসেছিল। ঘুম ভাবের চটকটা হঠাৎ কেটে যাবার মুহূর্তে বুঝে উঠতে পারছিলাম না কোথায় আছি। চারপাশে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারলাম এটা আমাদের কাং ইয়াৎসে বেইজ ক্যাম্প; যেখানে কিছুক্ষণ আগেই এসে পৌঁছেছি।

আমাদের নীল রঙের তাঁবুগুলো ইতোমধ্যেই পিচ করা হয়ে গেছে। কাং ইয়াৎসের গায়ে যুগ যুগ ধরে জমে থাকা বরফ গলে উচ্ছ্বল জল তরঙ্গ হয়ে তাঁবুগুলোর পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। জান্সকার নদীতে বিলীন হয়ে যাবার পরই তার যাত্রা শেষ হবে। ক্যাম্পের ঠিক উপরেই দানবের মত দাঁড়িয়ে আছে কাং-ইয়াৎসের দুই চূড়া। বিপরীত পাশে লাদাখের রুক্ষ বাদামী পাহাড়গুলো পুরো উপত্যকাটিকে ঘিরে রেখেছে। তাঁবু যেখানে পিচ করা হয়েছে সে জায়গাটা নরম সবুজ ঘাসে ছেয়ে আছে। মাঝে মাঝে কিছু জায়গায় নানা রঙের বুনো ফুল ফুটে আছে।

প্রকৃতির এই বিশালত্বের মাঝে দাঁড়িয়ে থেকেও এর অপার সৌন্দর্য কেন যেন ঠিক উপভোগ করতে পারছিলাম না। এক ধরনের ব্যাখ্যাতিত অস্বস্তি আমাকে শান্ত হতে দিচ্ছে না। যেখানে নতুন একটি জায়গা ঘুরে দেখার উচ্ছলতা থাকার কথা ছিল সেখানে অহেতুক দুশ্চিন্তা আর অস্তিরতা দানা বেঁধে উঠছে। প্রথববারের মত নিজেকে আমার এত একা মনে হচ্ছে।

আমি যে একটি দলের সাথে অভিযানে এসেছি সেটাই আমি অনুভব করতে পারছি না। শুধু তাই নয় আমিই নাকি এই টিম টিকে লিড দিচ্ছি। অত্যুক্তি করা হবে হয়তো, কিন্তু টিম লিড আমি এর আগে বহুবার করেছি; কখনো এমন বোধ হয়নি আগে। সবার সাথে কেমন যেন একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছে এই কদিনের মধ্যে। কিছুতেই আমাদের মধ্যে খাপ খাচ্ছে না। কেউ কাউকে বুঝতেই পারছি না। পর্বতাভিজানে এসে এমনটা তো হবার কথা ছিল না।

আমার শুধু মনে হচ্ছিল আমাদের মধ্যে কিছু একটা ঠিক নেই, আমাদের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব রয়েছে, আমরা সামিটে যেতে পারব না, কিছু একটা বিপদ হতে পারে—এই ধরনের নানা উল্টা-পাল্টা চিন্তা মাথা ভার করে রেখেছে। একবার ভাবি এমন অবস্থায় আমাদের সামিট পুশে যাওয়া উচিৎ হবে না। আরেকবার ভাবনা আসে এতদূর যখন এসেও যদি চষ্টা না করেই ফিরে আসি তাহলে কি হেরে যাব না? আমার ঠিক কি করা উচিৎ, আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। নিজের উপরই এখন রাগ উঠে যাচ্ছে।

কি অদ্ভুত এই একদিন আগেও আমার পর্বত-চুড়া-সামিট ইত্যাদি নিয়ে প্রচণ্ড উদ্দীপনা ছিল। এখন হুট করেই সেই বোধটি কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে। এত টাকা পয়সা খরচ করে, এত কাঠখড় পুড়িয়ে এই অভিযানে এসেছি এখন নাকি আমার আর ভাল লাগছে না। এখন মনে হচ্ছে এভাবে হুট করে পর্বতাভিজানে চলে আসা উচিৎ হয়নি। এখন মনে হচ্ছে পাহাড়কে না বুঝেই আমি তার কাছে চলে এসেছি। পাহাড়ে আরেকটু সময় কাটিয়ে, নিজেকে পরিপূর্ণভাবে পাহাড়ে আসার উপযুক্ত করে তবেই আসা উচিৎ ছিল। নিজের প্রস্তুতির এই অভাববোধ আমাকে ভাবিয়ে তুলছিল।

এখন খুব আফসোস হচ্ছে। পিছনে কত সুন্দর সুন্দর গ্রাম ফেলে রেখে এসেছি। কত সরল সহজ সেই গ্রামের মানুষগুলো। কত কম তাদের চাহিদা, কত কম তাদের প্রয়োজন। এই রুক্ষ মরুভূমি আর ঠাণ্ডার মধ্যে তারা কত সংগ্রাম করেই না টিকে থাকে। বাদামী ব্যাকগ্রাউন্ডের মাঝে ছোট ছট সবুজ-শ্যামল ওয়েসিসের মত ভেসে থাকা গ্রামগুলোতেই যদি এই সময়টুকু কাটিয়ে দিতাম তাহলেই বোধ হয় শান্তি পেতাম। পশ্চিম হিমালয়ের এই মানুষগুলো থেকেই হয়ত নিজেকে সংযত করা, অল্পে সন্তুষ্ট থাকা ও আমার নাগরিক ছুৎমার্গগুলো দূর করার একটা পথ খুঁজে পেতাম। কিন্তু আমি তো তখনো সামিটের স্বপ্নে বিভোর।

আমার ভাবনা ছিল কাং-ইয়াৎসে একটা ট্রেকিং পিক, যেখানে আরোহণ করার জন্য কোন ধরনের টেকনিক্যাল জ্ঞানের প্রয়োজন নেই। শুধু পায়ে হেঁটে উঠে যেতে পারলেই হল। কিন্তু এর কাছে এসে বুঝতে পারছি কত ভুল জানতাম। বারবার বেইজ ক্যাম্প থেকে হাই ক্যাম্পের অবস্থানটা দেখে নেয়ার চেষ্টা করছিলাম, পুরো পথটাই ছোট ছোট নুড়ি পাথরে ভর্তি । বুঝতে আর বাকি রইল না বেজ ক্যাম্প থেকে হাই ক্যাম্প হয়ে সামিট পুশ খুব একটা সহজ ব্যাপার হবে না। এর মধ্যেই ভারতীয় একটি দল বিধ্বস্ত হয়ে উপর থেকে নেমে এল। হাইক্যাম্প থেকে সামিট পুশ দিয়েও তারা সামিটে পৌঁছাতে পারেনি। ১০০ মিটার নিচ থেকেই তাদের চলে আসতে হয়েছে। তাদের ক্লান্ত অবসন্ন অবস্থা দেখে আমার আত্মবিশ্বাসে কিছুটা ভাটা পড়েছিল কি?

বেইজ ক্যাম্প পৌঁছানোর আগে। ছবি: লেখক

তাঁবুর দরজা খুলে দিলেই কাং ইয়াৎসে দুইয়ের কাঙ্খিত চূড়াটি দানবের মত আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। উজ্জ্বল রোদে তার শুভ্র শরীর ঝলমল করছে। যা ধারনা করে এসেছিলাম এটি তার চাইতেও বিশাল। এমন সাদার দিকে তাকিয়ে থাকলে কেমন যেন ঘোর লেগে যায়। এমন একটা সময় মনের মধ্যে সাহস আর জেদ বেড়ে উঠল। মনে একটা সংশয় আর আশংকা পাঁক খাচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার দিকে এগিয়ে যাবার তীব্র আকর্ষণটাও টের পাচ্ছিলাম। এক সময় আমার সিদ্ধান্ত আমাদের গাইড স্টেনজিনকে জানিয়ে দিলাম—আজ রাতেই আমরা সামিট পুশ দিব।

এই দিকে আমাদের খাবার রান্না চলছে। সামিট পুশের আগে ভালমত বিশ্রাম নেয়ার জন্য সন্ধ্যার মধ্যে ঘুমানোর প্ল্যান করলাম। স্টেনজিন রান্না শেষ করে ট্রেনিং সেশনের আয়োজন করল। আমরা সবাই আইস এক্স, ক্রাম্পুন, স্নো-বোট, হারনেস সব কিছু নিয়ে ট্রেনিং সেশনে যোগ দিলাম। ভেবেছিলাম অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ব। কিন্তু এই হিম মরুভূমিতে জুলাই মাসে রাত ৮টা বাজেও সূর্যের আলো পশ্চিম আকাশে লাল হয়ে ঝুলে আছে। সূর্যও বোধ হয় চায় না আজ অন্ধকার নামুক, আর মাঝরাতে আমরা পর্বতের অমোঘ আকর্ষণে বের হই।

ঘুমাতে গেলাম ঠিকই কিন্তু কেন যেন ঘুম আসছিল না। উত্তেজনা আর আশংকা সব কিছুই যেন ভর করছিল সমান তালে। পারবো তো সামিটে পৌঁছাতে! কেউ যদি সমস্যায় পরে যায় তখন কি করব! নানা হাবিজাবি চিন্তায় ঠিক মত ঘুমাতে পারছিলাম না । আমার পাশেই স্টেনজিন আর দুজন পোর্টার ঘুমিয়ে ছিল। ওরা দিব্বি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। একটা সময় মনে হল ধুর, অহেতুক চিন্তা করছি। যা হবার খবে, এখন ঘুমানো দরকার ।

রাত ১২ টার কিছু আগে স্টেনজিন ডেকে তুলল। ঘুম থেকে উঠে সবাই নিজেদের তৈরি করতে লাগলাম। সবাই সাথে কিছু শুকনো খাবার আর পানি নিয়ে সামিট পুশের জন্য বের হয়ে গেলাম।। আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার। এক ফোঁটা মেঘ নেই। হাজার হাজার তারা পুরো আকাশ ছেয়ে আছে, আজ সামিট পুশের সেরা সময়।

ভোরের কিছু আগে বেইজ ক্যাম্প থেকে অ্যাডভান্স ক্যাম্পে পৌঁছাই। মাথার উপর তখনো হেড ল্যাম্পের আলো জ্বলছে সাথে ভোরের ঘোলাটে আলোর মাঝে সাদা বরফগুলো কেমন জানি ভয়ংকর লাগছিল। আমাদের করোরই পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে হারনেস, গেইটার, ক্রাম্পন সেট করতে একটু দেরি করে ফেলি। ততক্ষণে পিছন থেকে আরেকটা টিম আমাদের পেরিয়ে অনেকটা উপরে উঠে গেছে।

যতই উপরে উঠতে লাগলাম বরফগুলো কেমন জানি নরম লাগছিল। আরো কিছু উপরে যেতে না যেতেই হালকা তুষারপাত শুরু হল। তখন মনে কেমন জানি ভয় ভয় লাগছিল। তার পরেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমরা যতই এগুচ্ছি কাং ইয়াৎসে যেন ততই দূরে চলে যাচ্ছে। পর্বত বোধ হয় সবসময়ই এমন রহস্যময় আর নির্মম। এখন বুঝতে পারছি মেসনার কেন লিখেছিল,

It’s always further than it looks. It’s always taller than it looks. And it’s always harder than it looks.

হঠাৎ অজিল কেমন সব অদ্ভুত আচরণ শুরু করল। সোল্ডারের পর থেকেই মাঝে মধ্যে সে আত্মরক্ষা রশি থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিচ্ছিল। যার ফলে আমাদের গতি আরও ধীর হয়ে যায়। আমরা ভেবেছিলাম ধীরে ধীরে গেলে হয়তো অজিলের সমস্যার উন্নতি হবে । কিন্তু যতই উপরের দিকে উঠতে থাকলাম সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠছে। আমরা অজিলকে বুঝিয়ে নিচে নেমে যেতে বললাম, কিন্তু সে কিছুতেই নামবে না।

যখন আমরা তার এই অবস্থায় বিচলিত তখন মেজাজ বিগড়ে দেবার মত খবর জানতে পারলাম। পেট খারাপ হয়ে যাওয়ায় বেস ক্যাম্পে সে আজ অনেকবার টয়লেটে গিয়েছিল, যা আমাদের সাথে শেয়ার পর্যন্ত করেনি। ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হওয়া যে উচ্চতা জনিত রোগের লক্ষণ—এটা বোধ হয় সে জানতই না। যদি অজিল নিজের সমস্যা আমাদের সাথে শেয়ার করত আমরা তখন ওকে নিচে রেখেই সামিট পুশ দিতাম না হয় একটা দিন অপেক্ষা করতাম। কিন্তু এখন তো আর কিছু করার নেই। আমাদের সামনে এগুনোর সকল রাস্তাই প্রায় বন্ধ।

মাথায় তখন চিন্তার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। একদিকে উপরে যাবার তীব্র বাসনা। আরেক দিকে দলের সবার নিরাপত্তা। মন থেকে বিষয়টি মেনে নিতে না পারলেও দলকে যেহেতু আমি নিজেই লিড দিচ্ছি তাই দ্রুত আমাকেই একটা সিদ্বান্ত নিতে হল। খারাপ কোন কিছু আমাদের সাথে ঘটুক তা আমরা কেউ চাচ্ছিলাম না। কিন্তু অজিলের মধ্যেও বলে যাচ্ছিল আরেকটু যেন উপরে যাই। ওকে নামানো যাচ্ছিল না । অবশেষে খুব বাজে ব্যবহার করে অজিলসহ সবাই নিচে নেমে যাই।

আমার মনে হয় বেশির ভাগ মানুষই স্বার্থপর হয়ে থাকে। অন্যকে কিছু দিতে বা অন্যের সাথে ভাগাভাগি করতে সবার মন সায় দেয় না। অন্যের কারণে নিজেকে বঞ্চিত করা তো দূরের কথা। এই যে এত দিনের স্বপ্ন, দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা আর প্রস্তুতি মিলিয়ে ২৯০ মিটার নিচ থেকে ফিরে এসে মনে হচ্ছে পাহাড় আমাকে অন্যের কথা ভাবতে শিখাচ্ছে। আবার এটাও ঠিক এতো কাছে গিয়ে ফিরে আসতে সত্যি অনেক খারাপ আর কষ্ট দুইটাই লেগেছিল। যতই নিচের দিকে নামছিলাম মনে হচ্ছিল কিছু একটা থেকে দূরে বহু দূরে সরে যাচ্ছি। কিন্তু এখন আমি উপলব্ধি করছি নিজেকে সংযত করার পাহাড়ের এই শিক্ষাটুকুই আমার পুরস্কার।

(Visited 1 times, 1 visits today)
তন্ময় সজীব
তন্ময় সজীব
তন্ময় সজীব পেশায় একজন বস্ত্র প্রকৌশলী। নিত্য নতুন ডেনিম জিন্সের ডিজাইন আর গবেষণা করাই অন্যতম কাজ। পেশার পাশাপাশি ভালবাসেন ক্রিকেট খেলতে আর পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে। আট হাজার মিটারের কোন পর্বতে সম্পূর্ণ নিজের সক্ষমতায় আরোহণ করা তার স্বপ্ন।

৩ thoughts on “অধরা স্বপ্ন

মন্তব্য করুন

*Please Be Cool About Captcha. It's Fun! :)